ক্যাটাগরিহীন

‘চুনিয়া ভাই আইছে চুন ধরি’

ভাদ্র মাস। তালপাকা গরম। চারপাশে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। কিন্তু তবুও প্রকৃতির সৌন্দর্য ভুলিয়ে দেয় গরমের বোধটাকে। আকাশে তুলোর মতো মেঘগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে। তুলির আঁচড়ে সেজেছে যেন নীল আকাশটা। সবুজ জমিনের ওপাশে সাদা-নীল আকাশের মিতালি। যেন শিল্পীর পটে আঁকা কোনো ছবি। শরতের এ দৃশ্য দেখতে কার না ভালো লাগে!
একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস আর প্রকৃতিকে অবগাহন করতে এসেছি  দিনাজপুরে। এক বন্ধুর বাড়িতে। কান্তজীর মন্দির, রামসাগর, রাজবাড়ির মতো অনন্য সব ঐতিহাসিক স্থানের পরশ নিয়ে ঘুরে দেখছি গ্রামের পথ-প্রান্তর।
এ অঞ্চলের মানুষদের একটি আচার আমাদের দৃষ্টি এড়ায় না। অতিথি আপ্যায়নে এখানে রয়েছে পানের ব্যবহার। পান খাওয়া লোকসংস্কৃতির এক প্রাচীন রীতি যা এখনও ধরে রেখেছে উত্তরবঙ্গের সরলপ্রাণ মানুষেরা। সামাজিক রীতি, ভদ্রতা, আচার আচরণের অংশ হিসেবে পান খাওয়ানো এখানকার অতি পুরোনো রেওয়াজ।
নিঃশ্বাস সুরভিত করে ও ঠোঁট জিহ্বাকে লাল করাতেই যেন অন্যরকম আনন্দ। এ কারণেই খাওয়া হয় পান। আর এ পানকে সুস্বাদু করে চুন। তাও আবার যেনতেন চুন নয়! এখানে সকলেরই পছন্দ ঝিনুকের চুন।
ঝিনুক পুড়িয়ে তৈরি করা হয় এ চুন। বন্ধু কাজিম জানাল, দিনাজপুরে রয়েছে এ চুন তৈরির একাধিক গ্রাম। এক সকালে আমাদের পায়ের ছাপ পড়ে তেমনই একটি গ্রামে।
গ্রামের নাম ভবাইনগর। দিনাজপুর শহর থেকে ফুলবাড়িয়া রাস্তায় কিলো ছয়েক পথ পেরোলেই গ্রামটি। এ গ্রামে চুন তৈরির কারিগরেরা বাস করে পাড়াভেদে। সকলের কাছে সেটি চুনিয়াপাড়া হিসেবে পরিচিত। চুনিয়াপাড়ায় বাড়ি সত্তরটির মতো। মাটি ঘেরা ছন দেয়া ঘর। একটির সঙ্গে অন্যটি লাগোয়া। এক বাড়ির চালে উঠে অনায়াসেই ঘুরে আসা যাবে গোটা পাড়াটি।
একটি বাড়ির উঠোনে ঝিনুক ছড়ানো। সেখানে গল্প জমিয়ে কাজ করছে দু’জন। যুবতী নারীটি বাঁশের চালনে ঝিনুক রেখে ময়লা সরিয়ে নিচ্ছে। আর যুবকটি চুনের উপযোগী ঝিনুকগুলোকে আলাদা করে রেখে দিচ্ছে এক পাশে। কথা বলে জানলাম এরা স্বামী-স্ত্রী। আলাপ জমে তাদের সঙ্গে।
শ্রী মঙ্গল চন্দ্র দেবনাথ পড়াশোনা না জানলেও স্ত্রী নেপালী রাণী পড়েছে ক্লাস এইট পর্যন্ত। চুন তৈরি মঙ্গলদের চৌদ্দপুরুষের কাজ। তার ভাষায়, ‘চৌদ্দ গুষ্টি ধরে চুনের কর্ম করে যাই।’
পাশ্ববর্তী মোহনপুর, চিরিরবন্দর, বনতারার মতো নদী এলাকায় কিছু লোক নদী থেকে সংগ্রহ করে আনে ঝিনুক। সেই ঝিনুকের খোসা কিনে এনে চুন তৈরি করেন মঙ্গলরা।
মঙ্গলের ভাষায়, ‘ওরা পানিতে ডুব দিয়ে ঝিনাই তুলি নিয়ে আসে, হাঁসে খাই নেয়, মানুষে খাই নেয় মাংসটা, আমরা খোসা কিনে নিয়ে আসি চুন বানাই।’
তিনি বলেন, ‘এক ডালি (১০কেজির মতো) ঝিনুক আশি টাকা। আমাদের তিন মণ মাল লাগে।’
যারা চুন তৈরি করে তাদের কি নামে ডাকা হয়? এমন প্রশ্নে মুখ খোলেন নেপালী ,‘আমাদেরকে চুনিয়া বলে।’
ঝিনুক এনে চুনিয়ারা প্রথমে পরিষ্কার করে কুটিতে (ঝিনুক পোড়ানোর এক প্রকার চুলা) খড়, কাঠ ও ঝিনুক পর্যায়ক্রমে সাজিয়ে আগুনে পোড়ায়। অতঃপর পোড়া ঝিনুক চালুনির মাধ্যমে বেছে মাটির গর্তে চুর্ন -বিচূর্ণ করে পানিতে মিশিয়ে মন্ডের মতো করে চুন তৈরি করে।
নেপালীর ভাষায়, ‘ঝিনাই বাছি নিয়া পানিত ভরকাইয়া দিতে হবে। তারপর জুড়াই নিয়ে বাঁশের নাটি দিয়া বসাইতে হবে। খুনতি দিয়ে খুরতে হবে। শেষে বাঁশের নাটি দিয়ে কুটিতে হবে।’
প্রস্তুতকৃত চুন জালের সাহায্যে ছেকে, বাঁশের ঝুড়িতে কলাপাতায় মুড়ে চুনিয়ারা হাটবাজারে ফেরি করে। দূর থেকে তাদের দেখলে দোকানদাররা হাঁকডাক দিয়ে বলে, ‘চুনিয়া ভাই আইছে চুন ধরি।’
ঝিনুক চুন কেন ভালো ? মঙ্গল বলেন, ‘এই চুনে ক্যালসিয়াম বেশি। অন্য চুন খাইলে অসুখ-বিসুখ হয়। একটু বেশি খাইলে মুখ পুড়ে যায়। এই চুনে মুখ পুড়ে না। এটা দেশি চুন বলা চলে।’
এক মণ ঝিনুক থেকে চুন হয় ১৩ কেজি। তাতে বিশেষ কায়দায় পানি মিশিয়ে  ৫০ কেজি করা হয়। মঙ্গল সে চুন প্রতি বৃহস্পতি ও সোমে বিক্রি করেন হাটে হাটে।
লাভের কথা উঠতেই মলিন মুখে নেপালীর উত্তর, ‘১০টাকা কেজি বিক্রি করে ১ টাকা লাভ। খাটন হিসেবে কোনো লাভ নাই।’
নেপালীর পাশের বাড়িটি রাণী বালার। গোটা বাড়িতে সাদা চুনের ছাপ। একটি ঘরের বারান্দাতে চলছে চুন তৈরি। পঞ্চাশোর্ধ্ব রাণী বালা চুনের মন্ডে পানি ছিটিয়ে ‘হত’ (এক ধরণের বাঁশের লাঠি) দিয়ে ঘুরাচ্ছেন অবিরত। সংসারের কাজ সেরে চুনিয়াপাড়ার নারীরা এভাবেই স্বামীর চুন তৈরিতে সাহায্য করেন নিত্যদিন।
চুন তৈরির কষ্টের কথা জানান রাণী বালা। বললেন, ‘কী কষ্ট দাদা, মাথা চক মারে। গোটা অঙ্গটা চুনদি শানা হয়ে যায়। শরীরে বেথা হয়, জ্বর আসে। শীতের সময় শরীরে কাপ আসি যায়।’
রাণীর কথায় সুর মিলায় নেপালীও। তার ভাষায়, ‘মাঝে মাঝে ফুটি যায় আঙ্গুলের মাথাগুলো। হাতের তালুতেও ক্ষত হয়। তখন গরমভাত হাত দি নাড়তে পারি না।’
ঝিনুক পুড়িয়ে চুন তৈরি একটি শিল্প। এ চুনের চাহিদাও বেশি। কিন্তু চুনের দাম কম হওয়া, ঝিনুকের দাম বৃদ্ধি আর দোকানদারদের বাকীর দৌরত্ম্যে ভালো নেই চুনিয়ারা। ফলে স্বল্প পুঁজিতে হুমকির মুখে পড়েছে চুনিয়াদের চৌদ্দপুরুষের পেশাটি। তবুও বুকভরা আশা চুনিয়াদের। এ শিল্পকে বাঁচাতে একদিন এগিয়ে আসবে সরকার কিংবা কোনো বেসরকারি উদ্যোগ।

© 2012 – 2018, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button