
যন্ত্রণায় চোখ ঝাপসা হয়ে এলেও সামাদ দমে যাননি। সামনে পুকুর, এক পাড়ে শত্রু আর অন্য পাড়ে তিনি।
একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতের সেই হত্যাযজ্ঞে যখন টালমাটাল রাজধানী ঢাকা, তার আঁচ গিয়ে পড়েছিল জামালপুরের সরিষাবাড়ীতেও। তখনো সেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পা রাখেনি, কিন্তু এর মধ্যেই তৎপর হয়ে ওঠে তাদের এদেশীয় দোসররা। গঠিত হয় শান্তি কমিটি, যার নেতৃত্বে ছিলেন রিয়াজ তালুকদার।
পাকিস্তানি সেনারা আসার আগেই স্থানীয় এই দোসররা শুরু করে পৈশাচিকতা। আরামনগর বাজারের ভেতর চারজন কর্মকারকে হত্যা করা হয়, হামলা চলে হিন্দুদের বাড়ি বাড়ি। এপ্রিল মাসে যখন সেনাবাহিনী সরিষাবাড়িতে প্রবেশ করে, তখন শান্তি কমিটির সহযোগিতায় শুরু হয় বেছে বেছে মানুষ ধরা আর নির্যাতন।
এমনই এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন এক টগবগে তরুণ- সরিষাবাড়ি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ছাত্র মো. আব্দুস সামাদ। তাদের ৫-৬ জনের দলটি বুঝতে পেরেছিল, ঘরে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে মৃত্যু নিশ্চিত। মে মাসের শেষ দিকে জন্মভূমির টানে ঘর ছাড়েন তারা। যমুনা নদী পাড়ি দিয়ে, মোল্লারচর হয়ে দুটি নৌকায় প্রায় দেড়শ তরুণের সঙ্গে তিনি পৌঁছান ভারতের নোঙ্গরপাড়ায়। সেখান থেকেই শুরু হয় এক যোদ্ধার জীবন।
মেঘালয়ের মাহেন্দ্রগঞ্জ বাজারের পাশে একটি মাদ্রাসায় ছিল তাদের অস্থায়ী ঠিকানা। একদিন খবর এলো মুক্তিযোদ্ধা নিয়োগের। তরুণ সামাদ দৌড়ে গিয়ে লাইনে দাঁড়ালেন। নির্বাচিত হওয়ার সাত দিন পর তাদের নিয়ে যাওয়া হলো মেঘালয়ের তুরা থেকে ২০ মাইল উত্তরের গভীর অরণ্যঘেরা তেলঢালা ক্যাম্পে। সেখানে ছিল তিনটি ব্যাটালিয়ন- ফার্স্ট, থার্ড ও এইট ব্যাটালিয়ন।
পুরো ব্রিগেডের দায়িত্বে ছিলেন জিয়াউর রহমান। আব্দুস সামাদ যুক্ত হন থার্ড ব্যাটেলিয়নের ই-কোম্পানিতে। সেখানে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে যখন সেক্টর ভাগ হলো, তখন ক্যাম্পে এলেন মেজর আবু তাহের। ২৮ দিনের কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে শুরু হয় সামাদের সম্মুখ সমর।

১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর। লক্ষ্য- সরিষাবাড়ির বাউশি রেলব্রিজ ধ্বংস করা। জগন্নাথগঞ্জ থেকে জামালপুরের মূল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিতে এই অপারেশন ছিল অপরিহার্য। চরের নির্জনতায় বসে আঁকা হয় ছক। সুজাবত কমান্ডার, লুৎফর রহমান লোদা, মান্নান কমান্ডার, মাসুম খান ও আমিরুল কমান্ডারের মতো যোদ্ধাদের সমন্বয়ে তৈরি হয় পরিকল্পনা।
মূল দায়িত্ব বর্তায় ‘দারোগা কোম্পানি’র ওপর। দারোগার নেতৃত্বে ১৭ জনের একটি দলে ছিলেন আব্দুস সামাদ। কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। ব্রিজের পশ্চিম পাড়েই ছিল পাকিস্তানিদের মজবুত ঘাঁটি। আগের রাতে বিস্ফোরক আর ডেটোনেটর নিয়ে তারা রওনা হন শ্যামগঞ্জ কালীবাড়ি থেকে।
পথে প্রথম বাটারা স্টেশনে ২২ জন রাজাকারের মুখোমুখি হন তারা। সামাদ, দারোগা, রফিক আর নৌবাহিনীর সামাদ- এই চারজন রাজাকারদের ক্যাম্পে ঢুকে তাদের আত্মসমর্পণ করান। এরপর একে একে দুটি স্টেশন জ্বালিয়ে দিয়ে তারা পজিশন নেন বাউশি ব্রিজের কাছের এক কামার বাড়িতে।
সকাল তখন ৯টা। হঠাৎ দেখা গেল একদল পাকিস্তানি সেনা হাত উঁচিয়ে ব্রিজ পার হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা ভেবেছিলেন তারা আত্মসমর্পণ করবে, কিন্তু সেটি ছিল পাকিস্তানিদের কৌশল। বাজারের কাছে নেমেই তারা অতর্কিত আক্রমণ চালায়। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। পাকিস্তানিদের ব্রাশফায়ারে একে একে ঢলে পড়েন সামাদের সহযোদ্ধা জালাল ও নৌবাহিনীর সদস্য সামাদ। গুলিতে কারো মাথার খুলি উড়ে যাচ্ছে, কারো পেট চিরে যাচ্ছে- চারপাশে কেবল রক্তের স্রোত আর আর্তনাদ।
এমন মৃত্যুপুরীর মাঝে নিজের অজান্তেই কখন আঘাতপ্রাপ্ত হন সামাদ। ধানখেতের ভেতর দিয়ে ক্রলিং করে যাওয়ার সময় মনে হলো বাম পায়ে কেউ হেঁচকা টান দিয়েছে। পরনে ছিল খাকি হাফপ্যান্ট। হাত দিয়ে স্পর্শ করতেই বেরিয়ে এলো হাড়ের গুঁড়ো। পেছনের ধানখেত ততক্ষণে নিজের রক্তে লাল হয়ে গেছে।
প্রচণ্ড যন্ত্রণায় চোখ ঝাপসা হয়ে এলেও সামাদ দমে যাননি। সামনে পুকুর, এক পাড়ে শত্রু আর অন্য পাড়ে তিনি। কানের পাশ দিয়ে শাঁ শাঁ শব্দে গুলি চলে যাচ্ছে, তার মধ্যেই সাঁতার কেটে ওপাড়ে উঠলেন তিনি। সেখানে দেখা পেলেন আরেক সহযোদ্ধা শাহজাহানের, যার পায়ের গোড়ালি উড়ে গেছে।
সেখান থেকে কোনোক্রমে একটি বাড়িতে আশ্রয় নিলে এক বৃদ্ধা মা তাকে পানি খাইয়ে সুস্থ রাখার চেষ্টা করেন। পরে সহপাঠী আব্দুল হামিদের সহায়তায় নৌকায় করে তাকে নেওয়া হয় শ্যামগঞ্জ কালীবাড়িতে। গ্রাম্য চিকিৎসকের প্রাথমিক চিকিৎসার পর শুরু হয় এক দীর্ঘ চিকিৎসা যাত্রা। মাহেন্দ্রগঞ্জ, তুরা, গুয়াহাটি হয়ে তাকে নেওয়া হয় লখনৌতে এবং সবশেষে বিহার সামরিক হাসপাতালে।
লখনৌ হাসপাতালেই অস্ত্রোপচার করে তার কোমর থেকে বের করা হয় পাকিস্তানি বুলেট। ড্রেসিংয়ের সময় ক্ষতের গভীরে গজ ঢুকিয়ে যখন পরিষ্কার করা হতো, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠতেন এই বীর। সেই হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই তিনি একদিন শোনেন কাঙ্ক্ষিত সেই খবর- দেশ স্বাধীন হয়েছে! এক নিমেষে সব শারীরিক কষ্ট ফিকে হয়ে যায় স্বাধীনতার অসীম আনন্দে।
আজও সেই ক্ষত বয়ে বেড়ানো বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সামাদ নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে তার অন্তিম বার্তাটি দিয়ে শেষ করেন— “তোমরা স্বাধীনতাবিরোধী ও রাজাকারদের কাছ থেকে সতর্ক থেকো। নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলো। তোমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে মুক্তিযোদ্ধাদের দোয়া থাকবে সবসময়।”
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১৪ মার্চ ২০২৬
© 2026, https:.




