
ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, “যে দেশে ওসমানের মতো হাজার হাজার সাহসী বীরের জন্ম, সে দেশকে তো দমানো যায় না।”
নেত্রকোণার বারহাট্টা উপজেলার গাভারকান্দা গ্রাম। এক শান্ত বিকেলে সেই গ্রামেই নিভৃতে বসে আছেন একাত্তরের এক তেজোদীপ্ত যোদ্ধা মো. ওসমান গণি তালুকদার। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও স্মৃতির পাতায় এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলো। শরীরের একটা অঙ্গ নেই ঠিকই, কিন্তু তার হৃদয়ে সগৌরবে টিকে আছে স্বাধীন বাংলাদেশের বিশাল মানচিত্রটা।
তার বাড়িতে বসেই কথা হয় মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন প্রসঙ্গে। একাত্তরে ওসমান গণি ছিলেন টগবগে ছাত্র। সে সময় নেত্রকোণায় কর্মরত অবাঙালিদের আধিপত্য আর বাঙালিদের প্রতি তাদের চরম অবজ্ঞা তার মনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি সেনারা যখন শান্তি কমিটির নেতা ফজলুল হকের সহায়তায় নেত্রকোণা শহরে হিন্দু ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছিল, তখনই ওসমান গণি উপলব্ধি করেন- হাত গুটিয়ে বসে থাকার সময় আর নেই। হয় পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে মরতে হবে, নয়তো লড়াই করে দেশ স্বাধীন করতে হবে।
১৯৭১ সালের মে মাসের এক ভোরে মায়ের কাছে ফুপুর বাড়ি যাওয়ার কথা বলে ঘর ছাড়েন তিনি। সঙ্গে ছিলেন বন্ধু আব্দুল হাকিম। বিজয়পুর সীমান্ত পেরিয়ে তারা আশ্রয় নেন ভারতের ‘মোহাদেও ইয়ুথ ক্যাম্পে’। সেখানে হাবিবুর রহমান খানের অধীনে মাসখানেক প্রাথমিক প্রশিক্ষণের পর তাদের পাঠানো হয় মেঘালয়ের তুরাতে।
পাহাড়ের প্রতিকূল পরিবেশে রাইফেল, স্টেনগান আর গ্রেনেড ছোড়ার কঠোর প্রশিক্ষণে কেটেছে দিন। সকালটা শুরু হতো ‘আমার সোনার বাংলা’ গেয়ে। পাহাড় বাওয়ার সেই কষ্ট তুচ্ছ হয়ে যেত কেবল দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দুচোখে ছিল বলে।
প্রশিক্ষণ শেষে ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে গেরিলা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন ওসমান গণি। ধর্মপাশা, কলমাকান্দা, দুর্গাপুর ও বিজয়পুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় তার ১২০ জনের কোম্পানিটি শত্রুসেনাদের তটস্থ করে রাখত। কমান্ডার ইসলাম উদ্দিন খান ও টোয়াইছি আবুল হোসেনের নেতৃত্বে তারা কয়েকটি ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে অপারেশন চালাতেন।
ডিসেম্বরে যখন চূড়ান্ত লড়াই শুরু হয়, তখন ওসমান গণিরা অবস্থান করছিলেন বাগমারা হাইট-আউটে। ওই মাসেই ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘যৌথ বাহিনী’। নেতৃত্বে ছিলেন মেজর মুরারি। নির্দেশ এলো পাকিস্তানি সেনাদের শক্তিশালী ঘাঁটি বিজয়পুর আক্রমণ করার।
৫ ডিসেম্বর রাত ১২টার পর পাহাড়ি পথ বেয়ে সতর্কতায় নিচু এলাকায় নেমে আসেন তারা। লক্ষ্য- শত্রুমুক্ত করতে হবে বিজয়পুর ক্যাম্প।
৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগ মুহূর্তে ওসমান গণিদের গ্রুপটি পাকিস্তানি সেনাদের ওপর মরণপণ আক্রমণ চালায়। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে টিকতে না পেরে সেনারা পিছু হটে দুর্গাপুরের দিকে চলে যেতে শুরু করে। ওসমান গণি তখনো সতর্ক। একটি বাংকার দখল করে ক্রলিং করে অন্যটির দিকে যাচ্ছিলেন। পাকিস্তানিরা যাওয়ার সময় সেখানে পেতে রেখেছিল মারণঘাতী মাইন, যেটি ছিল মরণফাঁদ।
হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণ! চারদিকে কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া। মাইনের আঘাতে দেহটা ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়ল একটি গাছের ডালে। জ্ঞান হারানোর ঠিক আগের মুহূর্তে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি। ডান পা হাঁটুর ওপর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন, ঝুলছে চামড়ার সামান্য অংশে। স্প্লিন্টারে বিদ্ধ হয়েছে বাঁ পা আর ডান হাতের আঙুলগুলোও।
সহযোদ্ধারা একটি দরজার পাল্লায় তাকে তুলে নিয়ে ছুটলেন বাগমারা ক্যাম্প হাসপাতালে। সেখানেই চিকিৎসকেরা তার সেই ছিন্ন পা চিরতরে কেটে বাদ দেন। ওসমান গণি আজও শিহরিত হন সেই দৃশ্য মনে করে। অপারেশনের পর দেখেছিলেন, বালতির অর্ধেকটা ভরে গেছে তার শরীরের তাজা রক্তে।
প্রচণ্ড যন্ত্রণার মাঝেও তিনি সহযোদ্ধাদের হাত ধরে শপথ করিয়েছিলেন, “হয়তো আমি বাঁচব না, কিন্তু তোমরা কথা দাও- দেশটাকে স্বাধীন করবে।” বীর মুক্তিযোদ্ধারা সেই কথা রেখেছিলেন। দেশ স্বাধীন হয়েছিল।
পরবর্তীতে ভারত সরকারের চিকিৎসায় তাকে তুরা, গৌহাটি, খিরকী এবং শেষে পুনা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানেই তার জীবনের এক পরম প্রাপ্তি ঘটে। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে হাসপাতালে আসেন। ওসমান গণির কেবিনে এসে তিনি তার যুদ্ধের বীরগাথা শোনেন এবং মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।
পরে এক জনসভায় ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, “যে দেশে ওসমানের মতো হাজার হাজার সাহসী বীরের জন্ম, সে দেশকে তো দমানো যায় না।”
আজ স্বাধীন বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে সেই দিনের সেই ত্যাগী যোদ্ধা ওসমান গণি তালুকদার নতুন প্রজন্মের চোখে স্বপ্ন দেখেন। তবে তার মনে একটি সতর্কবার্তা সব সময় কাজ করে। আগামী প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তার সনির্বন্ধ অনুরোধ- কেউ যেন ধর্মের নামে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে কলুষিত করতে না পারে। লাখো শহীদের রক্ত আর হাজারো ওসমানের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা যেন চিরকাল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভাস্বর থাকে।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ২ মার্চ ২০২৬
© 2026, https:.




