
তার দেহের সেই ক্ষতচিহ্নগুলো আজও যেন জানান দেয় এক স্বাধীন মানচিত্র অর্জনের রক্তক্ষয়ী আখ্যান।
একাত্তরের রণক্ষেত্র। একদিকে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধ, অন্যদিকে শত্রুর ডেরায় ঢুকে তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেওয়ার আত্মঘাতী মিশন। ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার দশম শ্রেণির এক ছাত্র তখন দেশমাতৃকার টানে নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে নেমে পড়েছেন লড়াইয়ে।
তিনি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আবুল বশির চৌধুরী। তার জীবনের প্রতিটি পরতে মিশে আছে একাত্তরের রক্তভেজা ইতিহাস আর রোমাঞ্চকর সব স্মৃতি।
ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার সইত্যনগর গ্রামের আমির হোসেন চৌধুরী ও মাধু বিবির দ্বিতীয় সন্তান আবুল বশির চৌধুরী তখন টগবগে তরুণ। যুদ্ধের দামামা বাজলে তিনি পাড়ি জমান ভারতে। সেখানে চোত্তাখোলা ক্যাম্পে ২১ দিনের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষ করে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য যান হরিণায়।
সেখানে ১৪ দিনব্যাপী বিশেষ ‘ক্যামোফ্লাজ’ বা ছদ্মবেশ ধারণের ওপর কঠোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। এই প্রশিক্ষণই তাকে এক বিপজ্জনক মিশনে নামতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে গোপনে শান্তি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল গুপ্তচরের মতো পাকিস্তানি সেনাদের সব পরিকল্পনা জেনে আসা। কাজটি যেমন কঠিন, তেমনই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও দেশের স্বার্থে রাজি হন বশির। তার সঙ্গী হন হাফিজ, তারেক ও হাবিব।

তাদের এই কাজে নেপথ্য নায়ক হিসেবে সাহায্য করেন ছাগলনাইয়ার পিস কমিটির তৎকালীন চেয়ারম্যান কানু মিয়া। বাইরে পিস কমিটির চেয়ারম্যান থাকলেও কানু মিয়া মূলত কাজ করতেন মুক্তিবাহিনীর হয়ে। প্রতি রাতেই পাকিস্তানি সেনাদের গতিবিধি ও পরিকল্পনার খবর তিনি পৌঁছে দিতেন ক্যাপ্টেন শামসুল হুদার কাছে।
বশির ও তার সঙ্গীরা মাটিয়াগোদায় শান্তি কমিটিতে ভর্তি হন। সেখানে দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ চলে। প্রশিক্ষণের শেষ দিনে এক পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন বশিরের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বলে ওঠে, “তুমকো কমান্ডার বানায়েগা। বানেগা?” ভড়কে গেলেও সামলে নেন বশির। পাশে থাকা কানু মিয়া হাসতে হাসতে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বলেন, “হোয়েগা, হোয়েগা।”
প্রশিক্ষণ শেষে তাদের পাঠানো হয় শান্তি কমিটির ফেনী অফিসে। সেখানেই তৈরি হয় শ্রীনগর এলাকার একটি বড় ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা। ব্রিজটি ছিল ভারতীয় সীমানায়, যে পথ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশে প্রবেশ করত। পাকিস্তানি সেনাদের পরিকল্পনা ছিল পাহাড়ের ওপর অবস্থান নিয়ে ব্রিজটি উড়িয়ে দেওয়া। কানু মিয়ার মাধ্যমে এই খবর ক্যাপ্টেন শামসুল হুদার কাছে পৌঁছালে আগেভাগেই সেখানে অবস্থান নেয় ভারতীয় সেনা ও মুক্তিযোদ্ধারা।
বশিররা কৌশলে এক্সপ্লোসিভ বা বিস্ফোরকগুলো ব্রিজে না লাগিয়ে পাশের গাছে লাগিয়ে আসেন এবং তারের সংযোগ পৌঁছে দেন পাহাড়ের চূড়ায় থাকা পাকিস্তানি সেনাদের কাছে। পাকিস্তানিরা কিছুই টের পায়নি। তারা যখন বিস্ফোরণ ঘটায়, তখন বিকট শব্দ হলেও ব্রিজটি থেকে যায় অক্ষত। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ থেকে সার্চলাইট জ্বালিয়ে আক্রমণ শুরু করে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনারা। দিশেহারা হয়ে পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করে।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তখন এই অপারেশনের খবরটি ‘মুক্তিবাহিনীর কেছকা মাইর’ শিরোনামে বহুবার প্রচারিত হয়েছিল। বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে বশিরদের পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল এক মণ চাল, এক কেজি রসুন, দুই কেজি ডাল ও কিছু টাকা। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কানু মিয়ার খবরটি পরে পাকিস্তানিরা জেনে যায় এবং তাকে গুলি করে হত্যা করে।
মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে আবুল বশির চৌধুরী মোট তিনবার আহত হয়েছিলেন। প্রথমবার সেপ্টেম্বরের শেষে চাঁদগাজিতে পাকিস্তানি সেনাদের মর্টারের স্প্লিন্টারে তার পিঠ ও বাঁ হাত ক্ষতবিক্ষত হয়। ভারতের কৃষ্ণনগরে তিনদিন চিকিৎসা নিয়ে আবারও ফিরে আসেন রণাঙ্গনে। কিন্তু ৮ ডিসেম্বরের সেই দিনটি ছিল অন্যরকম।
কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিমের একটি গ্রামে তখন দু’দিকের পাকিস্তানি সেনারা এসে জড়ো হয়েছে। ভোর ৫টা থেকেই থেমে থেমে চলছিল গোলাগুলি। প্রথম সারিতে থেকে যুদ্ধ করছিলেন বশির। দেড়-দুই দিন কোনো খাবার নেই, শরীর ক্লান্ত কিন্তু লক্ষ্য স্থির। দুপুরবেলা বশির ক্রলিং করে এগোচ্ছিলেন পাকিস্তানি বাংকারের দিকে।
কাদামাটির পিচ্ছিল পথ আর উঁচু আল পার হওয়ার সময় হঠাৎ একটি গুলি এসে বিঁধল তার বাঁ পায়ের ঊরুতে। উত্তেজনায় তখন কিছুই টের পাননি তিনি। সহযোদ্ধা আইজ্জা যখন তাকে বললেন, “ওই চৌধুরী, তোরে মনে হয় জোঁকে ধরছে”, তখন পেছনে তাকিয়ে দেখেন রক্তের লাল স্রোত। ক্ষতবিক্ষত বাঁ পায়ের গুলির জায়গায় আঙুল দিতেই বেরিয়ে এল গুঁড়ো হয়ে যাওয়া হাড়ের অংশ। মুহূর্তেই চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এলো।
জ্ঞান ফেরার পর তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন ভারতে বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালে। বাঁ পায়ের হাড়ে বসানো হয় লোহার পাত। এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ হাসপাতাল জীবন- ধর্মনগর, শিবচর, গৌহাটি ও পুনা হয়ে শেষ পর্যন্ত কলকাতার আর্মি হাসপাতালে চলে তার চিকিৎসা।
১৬ ডিসেম্বর এক ভারতীয় সৈনিকের মুখে শোনেন দেশ স্বাধীন হওয়ার বার্তা। গৌহাটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে দেখতে এসে মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, “তোমরা বাঘের বাচ্চা। তোমরা বীর। জাতি তোমাদের ভুলবে না।” সেই কথাগুলো বশিরের কানে আমৃত্যু বেজেছে।
যুদ্ধাহত এই বীর মুক্তিযোদ্ধা আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তবে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তিনি রেখে গেছেন এক দৃঢ় বার্তা। বলে গেছেন, “তোমাদের লেখাপড়া করে যোগ্য মানুষ হতে হবে। কাজের প্রতি সৎ থেকো। দেশপ্রেমের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যেও দেশকে। ধর্মের নামে দেশের ক্ষতি করতে দিয়ো না কাউকে। মুক্তিযোদ্ধাদের দোয়া তোমাদের সঙ্গে থাকবে।”
মুক্তিযোদ্ধা বশিরের দেহের সেই ক্ষতচিহ্নগুলো আজও যেন জানান দেয় এক স্বাধীন মানচিত্র অর্জনের রক্তক্ষয়ী আখ্যান।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ০৬ মার্চ ২০২৬
© 2026, https:.




