
একটি বুলেট তার বুকের বাঁ পাশের ওপরের অংশ বিদ্ধ করে হাতের সন্ধির পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়।
সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার ডেকাপুর গ্রাম। শরতের এক স্নিগ্ধ সকালে গ্রাম্য মেঠো পথ ধরে এগোতেই চোখে পড়ে এক শান্ত বাড়ি। সেই বাড়ির বারান্দায় বসে থাকা মানুষটির চোখের গভীরে তাকালে মনে হয়, তিনি যেন আজও ফিরে যান অর্ধশতাব্দী আগের সেই রক্তক্ষরা দিনগুলোতে।
তিনি মির্জা জামাল পাশা; মির্জা ফজলুর রহমান ও কুশমান বিবির মেজো ছেলে। বাবা ছিলেন সিলেট সিআর কোর্টের স্ট্যাম্প ব্যবসায়ী। ১৯৭১ সালে জামাল পাশা ছিলেন উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ছাত্র। বয়সে তরুণ হলেও সাহসে ছিলেন পাহাড়সম। একাত্তরের সেই মহাকাব্যিক দিনগুলোর কথা শুনতেই তার মুখোমুখি হওয়া।
জামাল পাশার স্মৃতিতে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, বরং শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠনিঃসৃত এক বজ্রধ্বনি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যখন বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন, জামাল পাশা তখন সশরীরে উপস্থিত ছিলেন সেই জনসমুদ্রে। নেতাদের সঙ্গে সিলেট থেকে পাড়ি জমিয়েছিলেন ঢাকায়। বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছ থেকে দেখার সেই অভিজ্ঞতা তার কাছে এক অলৌকিক মুহূর্তের মতো। জামাল পাশার ভাষায়, সেদিন বঙ্গবন্ধুকে তার মনে হয়েছিল যেন অনেক আপন কেউ।
মঞ্চে উঠে যখন বঙ্গবন্ধু বললেন, “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো…”, তখন জামাল পাশার মাথার ভেতর বিদ্যুতের ঝিলিক বয়ে গিয়েছিল। শত্রুর পরিচয়ও সেদিন তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যখন বঙ্গবন্ধু বললেন, “তোমরা ব্যারাকে থাকো… গুলি চালাবার চেষ্টা করো না…।” সেই অমর ঘোষণা- “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”, তরুণ জামাল পাশার হৃদয়ে স্থায়ীভাবে গেঁথে দেয় স্বাধীনতার স্বপ্ন।
সিলেটে ফিরে তিনি বাবাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “বাবা, স্বাধীনতা কিতা?” বাবার উত্তর ছিল সহজ কিন্তু গভীর। তিনি বলেছিলেন, “পচ্চিম ফাকিস্তানি ইতায় আমরারে বউত লাখান চুইয়া খাইছে। অখন আমরা মুক্ত অওয়া উ লাগব অকটাউ স্বাধীনতা।” বঙ্গবন্ধুর সেই ‘মুক্তির সংগ্রাম’ আর বাবার সেই ‘মুক্ত হওয়া’র ব্যাখ্যাই জামালকে যুদ্ধের নেশায় বুঁদ করে রাখে।
যুদ্ধ শুরু হলে মে মাসে জামাল পাশা প্রশিক্ষণের উদ্দেশে রওনা হন। প্রথমে কলকলি ঘাট বেসিক ট্রেনিং ক্যাম্পে লেফট-রাইট শিখতে শুরু করেন। খবর পেয়ে বাবা এসে তাকে ফিরিয়ে নিতে চাইলে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “যুদ্ধ করাত আইছি। শেষ না খরি যাইতাম না।” ছেলের জেদের কাছে হার মেনে বাবা ফিরে যান একা।

তারপর শুরু হয় আসল প্রস্তুতি। আসামের ইন্দ্রনগরে ২৮ দিনের নিবিড় প্রশিক্ষণ নেন তিনি। তার ফ্রিডম ফাইটার (এফএফ) নম্বর ছিল ১৭৩। প্রশিক্ষণকালে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা রাজারাম, কর্নেল বাকসী ও মেজর চৌহানের সাহচর্য পান তিনি। পরবর্তীতে জুনিয়র লিডারশিপ ট্রেনিংয়ের জন্য তাকে লোহারবনে পাঠানো হয়।
কিন্তু যুদ্ধের উন্মাদনা তাকে অস্থির করে তুলেছিল। সহযোদ্ধারা যখন রণাঙ্গনে, তখন প্রশিক্ষণে আটকে থাকা তার কাছে অসহ্য মনে হচ্ছিল। ফলে ৬০ দিনের কোর্স শেষ না করেই তিনি যোগ দেন ৪ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর সাব-সেক্টর জালালপুরে। সাব-সেক্টর কমান্ডার মাহবুবুর রব সাদী এবং সেক্টর কমান্ডার সিআর দত্তের অধীনে শুরু হয় তার সম্মুখ সমর।
জামাল পাশার যুদ্ধের প্রধান ক্ষেত্র ছিল জকিগঞ্জের আটগ্রাম। অগাস্ট পর্যন্ত তাদের অপারেশনের ধরন ছিল ‘হিট অ্যান্ড রান’। সন্ধ্যা হলেই তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান বাহিনীর ষোলঘর বাজার, রাজাটিলা, আটগ্রাম ও জকিগঞ্জ বাজার ক্যাম্পে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে সরে পড়তেন। এই প্লাটুনের কমান্ডে ছিলেন কুমিল্লার নবীনগরের বাইট্টা জাহাঙ্গীর আর সেকশন কমান্ডার ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদিল।
অক্টোবরের ১০ কিংবা ১২ তারিখ। লঘুচর ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন জামাল পাশারা। বিকেলের দিকে হঠাৎ ষোলঘর বাজার থেকে পাকিস্তানি সেনারা গোলাবর্ষণ (শেলিং) শুরু করে। প্রথম গোলাটি ক্যাম্পের পাশেই পড়লে সবাই পজিশন নেয়। গোলাবর্ষণ বন্ধ হওয়ার পর জামাল পাশা একটু এগিয়ে গিয়ে বাইনোকুলার দিয়ে শত্রুর অবস্থান দেখার চেষ্টা করেন। দূরে দু’জন পাঞ্জাবি সৈন্যের গতিবিধি লক্ষ্য করছিলেন তিনি। ঠিক তখনই আচমকা গুলির শব্দ।
একটি বুলেট তার বুকের বাঁ পাশের ওপরের অংশ বিদ্ধ করে হাতের সন্ধির পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। মুহূর্তেই ছিটকে পড়েন তিনি। অনুভব করেন বুক দিয়ে উষ্ণ রক্তধারা চুইয়ে পড়ছে। সহযোদ্ধারা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে নাদানপুর বিএসএফ ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মাসিমপুর আর্মি হেডকোয়ার্টারে। চার-পাঁচ দিন চিকিৎসার পর শরীর কিছুটা সুস্থ হলেও মন পড়ে ছিল রণাঙ্গনে। ক্ষতের যন্ত্রণা ছাপিয়ে জয়ের নেশা তাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় যুদ্ধের ময়দানে।
আজও সেই বুলেটের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন জামাল পাশা। শরীরের বাঁ পাশ আর বাঁ হাতটি অনেকটা অবশ হয়ে গেছে। ভারী কিছু তুলতে পারেন না, সারাক্ষণ চিনচিন করে ব্যথা হয় বুকে। কিন্তু এই কষ্ট তাকে বিচলিত করে না। নিজের দেশের মানচিত্র আর লাল-সবুজের পতাকার দিকে তাকালে সব ব্যথা ভুলে যান তিনি।
তবে সমাজ ও রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তার মনে কিছুটা ক্ষোভ রয়েছে। তার মতে, “শুধু রাজনীতিকরা নন, সাধারণ মানুষ যদি ঘুষ, দুর্নীতি আর লুণ্ঠনের মানসিকতা ত্যাগ করে, তবেই এই দেশ সত্যিকারের সোনার বাংলা হবে।” নতুন প্রজন্মের প্রতি তাঁর উদাত্ত আহ্বান, “তোমরা মিথ্যাকে পরিহার করো। স্বাধীনতাবিরোধীদের সম্পর্কে সজাগ থেকো। দেশকে ভালোবেসো। মনে রেখো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে থাকা মানেই দেশের পক্ষে থাকা। ক্ষমতার জন্য আমরা যেন বেঈমান না হই।”
মির্জা জামাল পাশারা শরীর দিয়ে রক্ত দিয়েছেন, শরীরের চিরস্থায়ী ক্ষত মেনে নিয়েছেন যাতে আমরা একটা স্বাধীন দেশে নিশ্বাস নিতে পারি। তার সেই ক্ষতচিহ্নগুলো আসলে আমাদের স্বাধীনতার একেকটি জীবন্ত দলিল।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ০৮ মার্চ ২০২৬
© 2026, https:.




