
রণপ্রস্তুতির শুরুটা ছিল ইছামতি ইয়ুথ ক্যাম্পে। সেখানে ২১ দিন চলে কঠোর লেফট-রাইট।
একাত্তরের উত্তাল মার্চ। বাংলার আকাশে তখন বারুদের গন্ধ আর ঘনিয়ে আসা ঘোর অমানিশা। ২৫ মার্চ রাতে রাজধানী ঢাকায় যখন পাকিস্তানি হায়েনারা নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, সেই আগুনের আঁচ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।
প্রাণভয়ে মানুষ তখন দিগ্বিদিক ছুটছে- শহর থেকে গ্রামে, গ্রাম থেকে সীমান্তের ওপারে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। চারদিকে কেবল অনিশ্চয়তা আর বিভীষিকা।
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার রহিসপুর গ্রামটি ছিল একেবারে সীমান্তঘেঁষা। সীমান্ত পার হলেই ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জির পাদদেশে ‘চেলা’ নামক স্থান। সেখানে গড়ে উঠেছিল বিশাল এক শরণার্থী শিবির। প্রতিদিন সীমান্ত পাড়ি দেওয়া অগণিত উদ্বাস্তু মানুষের মিছিল আর অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের নিঃশব্দ পদচারণা দেখতেন স্থানীয় তরুণ মো. মান্নান আলী। সেই দৃশ্যগুলো তার মনে স্বাধীনতার এক আকাঙ্ক্ষা বুনে দিচ্ছিল।
কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুতই ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পাশেই ছিল টেংরাটিলা, যেখানে পাকিস্তানি সেনারা আস্তানা গাড়ে। শুরু হয় আশপাশের গ্রামে গ্রামে অত্যাচার। নিরীহ গ্রামবাসীকে জোর করে ধরে নিয়ে পাকিস্তানিরা বাধ্য করত বাংকার খুঁড়তে। যারা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করত বা যেতে চাইত না, পুড়িয়ে দেওয়া হতো তাদের ঘরবাড়ি।
ভয়াল সেই দিনগুলোর স্মৃতি হাতড়ে মান্নান আলী শোনালেন এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের কথা। এপ্রিলের শেষ দিকে শুক্রবার ছিল দিনটি। পাকিস্তানি সেনারা ছাতক থেকে সুনামগঞ্জ যাওয়ার পথে দোয়ারাবাজারের নইনগাঁ গ্রামে তাদের লঞ্চ ভেড়ায়। জুমার নামাজ শেষে মুসল্লিরা যখন ঘরমুখী, ঠিক তখনই ঘটে সেই নারকীয় ঘটনা। মসজিদ থেকে ২৭ জন নিরীহ মুসল্লিকে ধরে এনে কোনো অপরাধ ছাড়াই সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানিরা।
এই নৃশংসতা মান্নান আলীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তখন তার মনে কেবল একটিই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল- ঘরে বসে থাকলে মরতে হবে পাকিস্তানিদের গুলিতে। মান্নান আলীর ভাষায়, “মরলে তো এমনেই মরমু, তাইলে যুদ্ধ কইরাই মরি।” এই জেদ থেকেই তিনি নিজের খালাতো ভাই মিরাস আলীর সঙ্গে জোট বাঁধেন। এক সন্ধ্যায় কাউকে কিছু না বলে ঘর ছেড়ে সীমানা পাড়ি দিয়ে চলে যান ভারতে।
রণপ্রস্তুতির শুরুটা ছিল ইছামতি ইয়ুথ ক্যাম্পে। সেখানে ২১ দিন চলে কঠোর লেফট-রাইট। এরপর তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় মেঘালয়ে, সেখানেও চলে টানা ২১ দিনের প্রশিক্ষণ। এরপর মান্নান আলীদের গন্তব্য হয় মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জির ‘ইকো ওয়ান’ ক্যাম্প। সেখানে ভারতীয় শিখ প্রশিক্ষকদের অধীনে চলে রাইফেল, এসএলআর, এলএমজি ও গ্রেনেড চালনার চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ।
সেই ক্যাম্পেই একদিন শপথ নেন এই মুক্তিকামী তরুণেরা, যেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং সেনাপতি আতাউল গনি ওসমানী। প্রশিক্ষণ শেষে শিলং থেকে অস্ত্র নিয়ে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় ৫ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার ভোলাগঞ্জে, যার নেতৃত্বে ছিলেন মেজর নূরুন নবী।
অক্টোবরের শেষ দিকে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে মাঠে নামেন মান্নান আলী ও তার সহযোদ্ধারা। নদী আর জঙ্গল ছিল তাদের আবাস। কমান্ডারের নির্দেশ আসা মাত্রই নিভৃতে অপারেশন চালিয়ে মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে যেতেন তারা। ছাতকের চাটিবর, লামনিগাঁও, চাহমারা ও দলেরগাঁওয়ের রণক্ষেত্রে বীরত্বের সাথে লড়াই করেছেন এই দলছুট গেরিলারা।
কিন্তু ৭ ডিসেম্বরের সেই বিকেলটি ছিল মান্নান আলীর জীবনের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী মুহূর্ত। সেদিন বিকেল ৩টায় মেজর নূরুন নবীর নেতৃত্বে পুরো কোম্পানি চাটিবর ক্যাম্প থেকে বের হয়। লক্ষ্য ছিল সুরমা নদী পার হয়ে ছাতক থানা দখল করা। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে যাচ্ছিলেন মান্নান আলী। তার ঠিক পাশেই লড়াই করছিলেন সহযোদ্ধা মিরাস আলী ও সিফাত আলী। পাকিস্তানি সেনারা তখন বৃষ্টির মতো আর্টিলারি শেল ছুড়ছে।
নদীপাড়ে নৌকায় ওঠার জন্য দৌড়ে যাচ্ছিলেন মান্নান আলী। তখনই বিকট এক শব্দে থমকে যায় পৃথিবী। নদীতীরের বালির নিচে পাকিস্তানি সেনাদের পুঁতে রাখা মাইনে পা পড়তেই সেটি বিস্ফোরিত হয়। ছিটকে পড়েন মান্নান। সংজ্ঞা হারানোর আগে আবছা চোখে নিজের ডান পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, গোড়ালিসহ পায়ের পাতাটি উড়ে গেছে। রক্তে লাল হয়ে গেছে নদীর বালুচর।
আহত অবস্থায় মান্নান আলীকে পরদিন ভোর ৪টায় ভোলাগঞ্জ হেডকোয়ার্টারে নিয়ে আসেন তার সহযোদ্ধারা। সেদিনই তারা ছাতক থানা শত্রুমুক্ত করেছিলেন। দুই দিন পর মান্নান আলীর যখন জ্ঞান ফেরে, তখন তিনি শিলং হাসপাতালে। সেখান থেকে গোহাটি এবং পরে পাঠিয়ে দেওয়া হয় পুনা সামরিক হাসপাতালে।
শিলং হাসপাতালে একবার এবং পুনা হাসপাতালে আরও দুইবার অস্ত্রোপচার করা হয় তার শরীরে। সারা শরীরে বিদ্ধ হয়েছিল অসংখ্য স্প্লিন্টার, যার একটি ছোট্ট টুকরো এখনো তার হাতের তালুতে স্মৃতির চিহ্ন হয়ে রয়ে গেছে।
যখন দেশ স্বাধীন হয়, মান্নান আলী তখন শিলং হাসপাতালে ব্যান্ডেজ জড়ানো শরীরে শয্যাশায়ী। কিন্তু বিজয়ের খবর যেন সব যন্ত্রণা ধুয়ে দিয়েছিল। তিনি স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, “মনে হইছে উড়াল দিয়া স্বাধীন দেশে চইলা যাই।”
যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর চেয়েও ভয়ংকর ছিল ঘরের শত্রু রাজাকাররা। বীরিশিং গ্রামের আলাউদ্দিন রাজাকার ছিল তেমনই এক বিশ্বাসঘাতক। মান্নান আলী মুক্তিযুদ্ধে গেছেন- এই খবরটি পাকিস্তানি ক্যাম্পে পৌঁছে দেয় সে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করা আর বাড়িতে পাকিস্তানিদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসাও ছিল তার কাজ।
রাজাকারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই একরাতে মান্নান আলীদের বাড়িতে পাকিস্তানি সেনারা হানা দেয়, যদিও তার আগে তার পরিবার সীমান্তে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে সক্ষম হয়েছিল।
আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মান্নান আলী স্বপ্ন দেখেন নতুন প্রজন্মের। তার বিশ্বাস, এই নতুন প্রজন্মের হাত ধরেই দেশ হবে বঙ্গবন্ধুর সেই ‘সোনার বাংলা’। তরুণদের প্রতি তার উদাত্ত আহ্বান- “তোমরা লেখাপড়া শিখে নিজেকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলো। দেশের প্রশ্নে সবাই এক থেকো। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে যারা মানুষকে বিভ্রান্ত করে, তাদের কাছ থেকে সব সময় দূরে থেকো।”
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ০৪ মার্চ ২০২৬
© 2026, https:.




