মুক্তিযুদ্ধ

সালামের আত্মত্যাগ বিফলে যেতে দিইনি: মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন

ক্ষতচিহ্নের গদ্য: পর্ব ১২

হুমায়ুন বাঙ্গালের যুদ্ধজয়ের গল্পগুলো যেমন বীরত্বের, তেমনি তা স্বজন হারানোর বেদনায় নীল।

একাত্তর সালের উত্তাল নভেম্বর। টাঙ্গাইলের আকাশ-বাতাস তখন বারুদের গন্ধে ভারী। শোষণের শৃঙ্খল ভাঙতে অকুতোভয় একদল তরুণ তখন যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তানি হানাদারদের সামনে। সেই দলে এমনই এক সূর্যসন্তান কাজী আশরাফ হুমায়ুন বাঙ্গাল।

তৎকালীন টাঙ্গাইল সাদাত কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের এই ছাত্রটি কলম ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন রাইফেল। তিনি ছিলেন কাদেরীয়া বাহিনীর ‘হনুমান’ কোম্পানির কমান্ডার।

হুমায়ুন বাঙ্গালের যুদ্ধজয়ের গল্পগুলো যেমন বীরত্বের, তেমনি তা স্বজন হারানোর বেদনায় নীল। তার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ‘হিট অ্যান্ড রান’ পদ্ধতিতে এবং সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে পাকবাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত রাখতেন। তার অধীনে ছিল দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্প- ক্যারামজানি ও বেংগুলা। স্থানীয় মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা আর সহযোগিতাই ছিল তাদের যুদ্ধের প্রধান রসদ।

একাত্তরের স্মৃতি হাতড়ে হুমায়ুন বাঙ্গাল এক রোমহর্ষক অপারেশনের বর্ণনা দেন। ঘটনাটি ঘটেছিল কয়রা নামক স্থানে। এক রাতে মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় দুই গাড়ি অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুকিয়ে রেখেছিলেন স্থানীয় একটি কবরস্থানে। কিন্তু সেই খবর পৌঁছে যায় মধুপুর আর্মি ক্যাম্পে। এক বিশ্বাসঘাতকের দেওয়া তথ্যে পাকিস্তানি সেনারা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে মার্চ শুরু করে।

খবর পেয়ে পিছু হটেননি হুমায়ুন বাঙ্গাল ও তার দলের ৫০-৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা। তাদের হাতে তখন এলএমজি, থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল আর মর্টারের মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র।

নদী পার হয়ে পাকিস্তানি সেনারা যখন রেঞ্জের ভেতর ঢোকে, তখনই গর্জে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র। পাখির মতো ঝরতে থাকে পাক সেনাদের প্রাণ। চরপাড়া কয়রার সেই ভয়াবহ যুদ্ধে পাকিস্তানিরা প্রায় দুই গাড়ি লাশ নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। যুদ্ধজয়ের সেই খবর প্রচারিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও।

কিন্তু সেই জয়ের আনন্দের মাঝেও ছিল বিষাদের ছায়া। পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন সহযোদ্ধা সালাম। তার ওপর চালানো হয় নির্যাতন; মুখে ও গলায় আঘাত করে, রশি দিয়ে টেনে রাস্তায় ফেলে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

কবরস্থান থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলোও কেড়ে নেয় শত্রুরা। তবুও দমে যাননি হুমায়ুন বাঙ্গাল। এরপর একে একে তিনি বীরত্বের ছাপ রাখেন পানকাতা, বেংগুলা, সুন্দরপাড়া ও গোপালপুর থানার বিভিন্ন অপারেশনে।

তবে নাগরপুর থানা অপারেশনের দিনটি ছিল হুমায়ুন বাঙ্গালের জীবনের সবচেয়ে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া অধ্যায়। দিনটি ছিল ৩০ নভেম্বর। নাগরপুরের লাউহাটিতে ক্যাম্প করে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আরেকটি কোম্পানি গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সেখানে মির্জাপুর, নাগরপুর ও ধামরাইয়ের দামাল ছেলেরা যোগ দিয়েছিল। কাদের সিদ্দিকীর সিগন্যাল পেয়ে নাগরপুর থানা আক্রমণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

সেদিন উত্তর-পশ্চিম দিকে ছিল হুমায়ুন বাঙ্গালের দল, দক্ষিণে স্বয়ং কাদের সিদ্দিকী। থানার পেছনে ছিল বিশাল এক বিল, আর একপাশে রাস্তা। পালানোর কোনো পথ ছিল না; হয় জয়, নয় মৃত্যু- এমন এক কঠিন সমীকরণে দাঁড়িয়ে শুরু হয় যুদ্ধ। এর আগেও তিনবার নাগরপুর থানা আক্রমণ করে ব্যর্থ হয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। তাই এবারের লড়াই ছিল মরণপণ।

পাকিস্তানিদের একটি গুলি বাঙ্গালের পিঠের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে বাঁ পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়, সেই ক্ষত আজও স্পষ্ট; ছবি: সালেক খোকন।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে হুমায়ুন বাঙ্গাল ও তার সহযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন পাহাড়ি খালের পাশের একটি নিচু জায়গায় পজিশন নেন। পাহাড়ি গ্রেনেড থ্রো রাইফেলটি ফিট করছিলেন, আর হুমায়ুন বাঙ্গাল একের পর এক গ্রেনেড ছুড়ছিলেন। প্রথম গ্রেনেডটি নিখুঁত নিশানায় শত্রুদের বাংকারে গিয়ে পড়লে বিকট শব্দে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় পাক সেনাদের দেহ।

উত্তেজনায় ও বিজয়ের উল্লাসে হুমায়ুন বাঙ্গাল তখন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ওঠেন। চিৎকার করে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণ করতে বলে গালি দেন। তার সেই স্পর্ধা সহ্য করতে পারেনি পাকিস্তানিরা। ওপাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুড়তে শুরু করে তারা, আর চিৎকার করে বলতে থাকে- ‘শালা কুত্তার বাচ্চা বাঙ্গাল!’

রাগের মাথায় হুমায়ুন বাঙ্গাল তখন পজিশন ছেড়ে রাস্তার ওপর উঠে বসেন। পাহাড়ি তখন রাইফেলের নলে গ্রেনেড ভরছেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে যায় সেই অবিশ্বাস্য ও ভয়াবহ ঘটনা। পাকিস্তানি বাহিনীর একটি এলএমজির বুলেট বাতাসের গতিতে ধেয়ে এসে হুমায়ুন বাঙ্গালের পিঠের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে বাম পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়।

সেই একই বুলেট এরপর পাহাড়ির গাল ও চোয়াল চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। এক গুলিতেই দুই যোদ্ধা ধপাস করে লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। রাইফেলের নলে থাকা গ্রেনেডটি যদি তখন সামান্য বেরিয়ে থাকত, তবে দুজনের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত মুহূর্তেই।

রক্তে ভেসে যাচ্ছিল মাটি। হুমায়ুন বাঙ্গাল অনুভব করছিলেন, তার শরীর যেন আগুনের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। পাশেই নিথর পড়ে আছেন পাহাড়ি। নিজের অসহ্য যন্ত্রণা ভুলে হুমায়ুন বাঙ্গাল পাহাড়িকে জড়িয়ে ধরে শেষবারের মতো ‘কালেমা’ পড়ার অনুরোধ করেন। পাহাড়ি কোনো সাড়া দিচ্ছিলেন না। ভাবা হয়েছিল তিনি শহীদ হয়েছেন, কিন্তু খানিক পরেই পাহাড়ির গোঙানি শুনে সহযোদ্ধারা আশার আলো দেখেন।

সহযোদ্ধারা দ্রুত একটি চোঙ্গার ওপর তাদের শুইয়ে প্রায় দশ-বারো মাইল দূরে লাউহাটি ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে কাদেরীয়া বাহিনীর চিকিৎসক ডা. শাহজাদার তত্ত্বাবধানে শুরু হয় প্রাথমিক চিকিৎসা। অবস্থা বেগতিক দেখে পরে ডা. জামান ও নার্স মায়াধরকে তলব করা হয়। বর্ণিল নামক স্থানে তাদের দীর্ঘ চিকিৎসা চলে। সেই একই অপারেশনে আহত হয়েছিলেন আরেক মুক্তিযোদ্ধা সামসুও।

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা এই বীর যোদ্ধা হুমায়ুন বাঙ্গাল সুস্থ হওয়ার পর আবারও ফিরে গিয়েছিলেন রণাঙ্গনে। তার শরীরের সেই ক্ষতচিহ্নগুলো আজও একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। আজ যখন তিনি ফেলে আসা সেই দিনগুলোর কথা ভাবেন, তখন গর্বে বুক ভরে ওঠে তার। কারণ, তার বিশ্বাস- সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম আত্মত্যাগই এনে দিয়েছে আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১২ মার্চ ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button