মুক্তিযুদ্ধ

পণ্ডিতের দেশে মূর্খও জ্ঞানী, মূর্খের দেশে জ্ঞানীও মূর্খ: মুক্তিযোদ্ধা জমির

ক্ষতচিহ্নের গদ্য: পর্ব ১৮

শিক্ষার আলোতেই একাত্তরের স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

আয়নার সামনে দাঁড়ালে আজও একাত্তরের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ জমির আলীর চোখের পাতায়। নাকের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই গভীর ক্ষতটি কেবল এক টুকরো মাংসের জখম নয়, বরং এটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য স্বাক্ষর।

একাত্তরের এক রক্তঝরা দিনে পাকিস্তানি বাহিনীর কামানের গোলার একটি স্প্লিন্টার তার নাক কেটে বেরিয়ে গিয়েছিল, আর সেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল ডান কানটি। সুনামগঞ্জের দোয়ারা বাজার উপজেলার চণ্ডীপুর গ্রামের এই বীর সেনানীর যুদ্ধের প্রতিটি অধ্যায় যেন বীরত্ব আর ত্যাগের এক মহাকাব্য।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। ঢাকা যখন পাকিস্তানি সেনাদের নারকীয় তাণ্ডবে জ্বলছিল, তখন দেশের অন্যান্য শহরগুলোর মতো সুনামগঞ্জের আকাশে ও বাতাসেও ঘনিয়ে আসছিল বিপদের মেঘ। চৈত্র মাসের শেষ দিকে পাকিস্তানি সেনারা হানা দেয় সুনামগঞ্জ, টেংরাটিলা আর ছাতকে। শুরু হয় অবর্ণনীয় অত্যাচার।

তবে বিদেশি শত্রু সেনাদের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল এদেশীয় দোসররা। জমির আলীর স্মৃতিচারণে উঠে আসে সেই নির্মমতার চিত্র। শান্তি কমিটির আড়ালে আসকর আলী মাস্টার, মাওলানা আবদুস সাত্তার ও রউস মৌলভীরা মেতে ওঠে পাঞ্জাবিদের সেবায়। তাদেরই মদদে গড়ে ওঠে রাজাকার বাহিনী। এই রাজাকাররাই গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে ঘরবাড়ি চিনিয়ে দিত, পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দিত যুবতী মেয়ে আর রসদ। বিশেষ করে হিন্দু পাড়াগুলোতে লুটতরাজ আর অগ্নিসংযোগ ছিল তাদের নিত্যদিনের কাজ।

সুরমা নদীর উত্তর পাড়ে তখন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল রাজাকার বুধাই এবং তার চেয়েও ভয়ঙ্কর দালাল ফকির চেয়ারম্যান। একবার প্রশিক্ষণের জন্য ১৩ জন ছাত্র যখন সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছিল, বিশ্বাসঘাতক ফকির চেয়ারম্যান সেই খবর পৌঁছে দেয় পাকিস্তানি সেনাদের কাছে। ঘাতকের বুলেটে সেই ১৩ জন তরুণের স্বপ্ন বিসর্জিত হয় এক নিমিষেই।

এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার শপথ নেন জমির আলী। আষাঢ় মাসের প্রথম সপ্তাহে সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে হরিণাবাটি ও বেটিরগাঁও হয়ে তিনি পৌঁছান ভারতের মেঘালয়ের বাঁশতলায়। সেখানে এমএনএ হক সাহেবের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তাকে পাঠানো হয় ‘ইকো ওয়ান’ ক্যাম্পে। ১১ নম্বর ব্যাচে টানা ২৮ দিন গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন তিনি।

প্রশিক্ষণ শেষে তারা হয়ে ওঠেন এক একজন গেরিলা। ডিনামাইট দিয়ে ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়া কিংবা গ্রেনেড ছুড়ে শত্রুর বুকে কম্পন ধরিয়ে দেওয়াই ছিল তাদের প্রধান কৌশল।

জমির আলীর যুদ্ধের ঝুলি থেকে বেরিয়ে আসে এক দুর্ধর্ষ অপারেশনের গল্প। লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি দালাল মাওলানা আবদুল হককে বন্দি করা। ছাতকের চর বারকুয়া গ্রামে সেই কুখ্যাত মৌলভীর বাড়ি ঘেরাও করেন তারা। রাতের অন্ধকারে মুক্তিযোদ্ধাদের অতর্কিত আক্রমণে পাহারারত রাজাকাররা পালিয়ে যায়। ভোরের আজানের সময় মাওলানা হককে বন্দি করে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে শ্রীপুর গ্রামে আশোক আলীর বাড়িতে পৌঁছান।

আশোক আলী ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের একনিষ্ঠ সমর্থক। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের খাসি জবাই করে আপ্যায়ন করান। কিন্তু সেখানেও ওত পেতে ছিল বিপদ। শ্রীপুর মসজিদের ইমাম ছিল কুমিল্লার এক মাওলানা, যে গোপনে খবর পৌঁছে দেয় কৈতকের পাকিস্তানি ক্যাম্পে। মুক্তিযোদ্ধারা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে ফিরলেও পাকিস্তানি সেনারা ক্ষোভে পুরো শ্রীপুর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। জমির আলীর ভাষায়, “রাজাকাররা না থাকলে পাকিস্তানিরা এত বড় গণহত্যা চালাতে পারত না।”

এরপর ১০ নভেম্বর ১৯৭১। ছাতকের বুরকি নামক স্থানে শুরু হয় এক প্রচণ্ড সম্মুখ যুদ্ধ। ফতেবুলের নেতৃত্বে ৩৫ জনের একটি মুক্তিযোদ্ধা দল তখন সম্মুখ সমরে। পাকিস্তানি সেনারা গোবিন্দগঞ্জে অবস্থান নিয়ে কামানের গোলাবর্ষণ করছে। জমির আলী একটি বাঁশঝাড়ের নিচে পজিশন নিয়ে আছেন, পাশে রয়েছেন সহযোদ্ধা শওকত আলী।

সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ একটি আর্টিলারির গোলা এসে পড়ে জমির আলীর ঠিক পাশেই। বিকট শব্দে ফেটে যায় তার কানের পর্দা। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে পাশের আস্ত বাঁশঝাড়টি। হঠাৎ জমির আলী অনুভব করেন তার নাক দিয়ে পিনপিন করে রক্ত পড়ছে। হাত দিয়ে স্পর্শ করতেই দেখেন কান দিয়েও রক্তের ধারা নামছে।

একটি স্প্লিন্টার তার নাক কেটে বেরিয়ে গিয়েছিল। সহযোদ্ধা শওকত আলীর উপদেশে গামছা দিয়ে নাক বেঁধে কোনোমতে জীবন বাঁচান তিনি। এরপর তাকে কৈতক ফিল্ড ক্যাম্পে পাঠানো হয় চিকিৎসার জন্য। কিন্তু রণাঙ্গনের ডাক যার রক্তে মিশে আছে, তাকে কি আর হাসপাতালে আটকে রাখা যায়? মাত্র তিন দিন পর ব্যান্ডেজ নিয়ে আবারও তিনি ফিরে আসেন বুরকি ক্যাম্পে। শুধু এই বুরকি নয়, মোহাম্মদপুর, আলগোরা, কবিরখালি, বালুরগাঁ, বালিউড়া ও টেবলাইয়ের যুদ্ধের স্মৃতি আজও তার হৃদয়ে উজ্জ্বল।

জীবনের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে এই যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আগামী প্রজন্মের কাছে পাহাড়সম আশা পোষণ করেন। তার মতে, একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো শিক্ষা। তিনি দর্শনের সুরে বলেন, “মনে রাখতে হবে, পণ্ডিতের দেশে মূর্খ থাকলে সেও জ্ঞানী। আর মূর্খের দেশে পণ্ডিত থাকলে তাকেও মূর্খ ভাবা হয়।”

তাই শিক্ষার আলোয় গোটা দেশকে আলোকিত করার মাধ্যমেই একাত্তরের সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। জমির আলীর নাকের সেই ক্ষতচিহ্ন আজও আমাদের প্রেরণা দেয় এক চিরন্তন সত্যের- এই স্বাধীনতা কোনো দান নয়, বরং অগণিত প্রাণের রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে এক অর্জন।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১৮ মার্চ ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button