একদিনে ১৩০০ মানুষ হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা

লাশের স্তূপ থেকে ফিরে আসা: একাত্তরের এক অলৌকিক উপাখ্যান
তেরোই এপ্রিল, ১৯৭১। স্থান রাজশাহীর চারঘাট থানাপাড়া, সারদা পুলিশ একাডেমি চত্বর। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সেদিন সেখানে এক ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছিল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে প্রায় হাজারের ওপর নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে তারা। সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞে হয়তো শহীদ হতেন অধ্যাপক জিন্নাতুল আলম জিন্নাও। কিন্তু অলৌকিকভাবে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসেন তিনি।
সারদা পুলিশ একাডেমির পাশেই ছিল তার বাড়ি। তখন তিনি সম্মান চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। থানাপাড়া গণহত্যায় খুব কাছ থেকে দেখেছেন প্রিয়জনের মৃত্যু, নিজের কাঁধে টেনেছেন লাশের ভার, শহীদদের রক্তে ভিজেছে তার শরীর। সেই রক্তাক্ত দিনটির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি শিউরে ওঠেন।
সেদিন পাকিস্তানি সেনারা চারদিক থেকে এমনভাবে ঘিরে আসছিল যে, সারদা পুলিশ একাডেমির পেছনের পদ্মা নদীর পাড়টিকেই পালানোর একমাত্র পথ মনে করেছিলেন সবাই। অনেকের ধারণা ছিল, সাঁতার দিয়ে ওপারে ভারতে চলে যাবেন। ফলে আশপাশের গ্রামগুলো থেকেও বহু মানুষ সেখানে জড়ো হন। পাশেই ছিল ক্যাডেট কলেজ। সেখানকার লোকজন এবং সারদা পুলিশ একাডেমির পুলিশ সদস্যরাও সিভিল ড্রেসে সেখানে এসে উপস্থিত হন।
বেলা তখন আনুমানিক দুইটা বা আড়াইটা। এক পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের কমান্ডে সেনারা পুলিশ একাডেমির ভেতরে প্রবেশ করে। তাদের দেখেই চরের মধ্যে মানুষের ছোটাছুটি শুরু হয়ে যায়। প্যারেড গ্রাউন্ডের ওপর দাঁড়িয়েই পাকিস্তানি সেনারা উর্দুতে চিৎকার করে বলতে থাকে, “ইধার আও, ইধার আও। তোমকো লেকার হাম মিটিং কারেগা। মিটিং কে বাদ তোমকো ছোড় দেগা।” (এদিকে এসো, তোমাদের নিয়ে মিটিং করব। মিটিং শেষে ছেড়ে দেব।)
বিশ্বাস করে চরের মধ্যে সবাই একত্রিত হয়। এরপরই শুরু হয় পৈশাচিকতা। সেনারা প্রথমেই নারী ও শিশুদের আলাদা করে ধমক দিয়ে বলে, “তুম ঘার মে চলে যাও।” তখনই এক বিষাদময় করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। একজন স্ত্রী কি তার স্বামীকে ছেড়ে, কিংবা একটা ছোট্ট শিশু কি তার বাবাকে ছেড়ে যেতে চায়? কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা ধাক্কা দিয়ে, লাথি মেরে তাদের ছাড়িয়ে দেয়। নারী-শিশুরা চলে যাওয়ার পর সেখানে তখনো প্রায় তেরোশো মানুষ।
ওরা কোনো মিটিং করল না। সিপাহিরা অস্ত্র তাক করে চারদিক ঘিরে ফেলল। ক্যাপ্টেন তখন নিজের অস্ত্র লোড করছে। আমার সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই শফিকুল আলম পান্না, চাচা আজিজুল আলম, চাচার বড় ছেলে খায়রুল আলম পরাগ, আমার ছোট ভগ্নিপতি মহসীন আলীসহ গ্রামের অনেক পরিচিত মুখ।
জোয়ান বা কমবয়সি যুবকদের ওরা একে একে ডাকতে শুরু করল। প্রথমে ওঠাল পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল সাহেবের গাড়ির ড্রাইভার শামসু ভাইকে। ওই ক্যাপ্টেন খুব কাছ থেকে শামসু ভাইয়ের বুকে গুলি করল। গুলি খেয়ে কয়েক হাত ওপরে ছিটকে উঠে তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। মুখ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছিল। দু-এক মিনিট ছটফট করেই তার শরীর নিথর হয়ে গেল।
এরপরই ওঠানো হলো পুলিশ একাডেমির স্টেনোগ্রাফার কাজী গোলাম মোস্তফাকে। তাকেও একইভাবে গুলি করে হত্যা করা হলো। এভাবে একে একে ১০ থেকে ১৫ জনকে হত্যা করল ওরা।
ওদের ওয়্যারলেসে বারবার মেসেজ আসছিল, ফলে ওরা তাড়াহুড়ো করছিল। ওরা আসার আগেই আমি লুঙ্গি পরে, খালি গায়ে, মুখে কাদা মেখে সাঁতার দিয়ে পদ্মা নদী পার হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে বসে ছিলাম। হঠাৎ ওরা আমাকে ডাক দিল, “এই বাচ্চু ইধার আও, ইধার আও।”
আমি উর্দু ভালো বুঝতাম, কথাও বলতে পারতাম। ওটাই তখন কাজে লাগালাম। ওরা জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কিয়া হ্যায়?” আমি আমার ডাক নামটাই বললাম- “জিন্না”। নামটা শুনেই হয়তো ক্যাপ্টেনের মন গলে গেল। উর্দুতে অনেক কথা বলার পর ক্যাপ্টেন বলল, “ঠিক হ্যায়, তোমকো নেহি মারেগা, তুম ইধার বেঠো।”
আমার সঙ্গে আরও ছয়-সাতজনকে আলাদা করে বসাল। তাদের মধ্যে গ্রামের সোলায়মান ভাই ও তোসাদ্দেক নামে এক মুরগি ব্যবসায়ীও ছিলেন। ওয়্যারলেসে তখনো বার্তা আসছিল, ওপাশ থেকে দ্রুত সবাইকে হত্যা করার তাড়া দিচ্ছিল। তখন ওরা ব্রাশফায়ার করার প্রস্তুতি নিল। হত্যাযজ্ঞ শুরু করল স্বয়ং ওই পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন। টানা ২০ বা ২৫ মিনিট ধরে চলল এই নৃশংসতা। এরপর একজন সিপাহির হাতে অস্ত্র দিতেই সে-ও ফায়ার শুরু করল। মানুষের রক্তে ভেসে যেতে থাকল গোটা চরের মাটি।
ব্রাশফায়ার চলতেই চাচাতো ভাই খায়রুল আলম পরাগের কণ্ঠ শুনতে পেলাম। ‘আম্মা!’ বলে একটা চিৎকার দিল সে। এরপর আর কোনো সাড়া নেই! বুঝে গেলাম, পরাগ ভাই আর নেই। ২০-২৫ মিনিট পর গোটা চরটাই নীরব নিথর হয়ে গেল।
আমাদের ওরা প্যারেড গ্রাউন্ডে নিয়ে এলো। জায়গাটা বেশ উঁচুতে। খানিক পরই সেখান থেকে দেখা গেল, চরে স্তূপ করা লাশের ভেতর থেকে অনেকেই পালাচ্ছে। সবাই রক্তাক্ত। যন্ত্রণায় দিকবিদিক ছুটছে। কেউ ওপরের দিকে, কেউবা নদীর দিকে যাচ্ছে। দৃশ্যটি দেখে ওই ক্যাপ্টেন চিৎকার করে বলে উঠল, “শালা ইয়ে লোক তো জিন্দা হ্যায় আব তাক! এলএমজি ছোড়ো, এলএমজি ছোড়ো।” এরপর এলএমজি চালিয়ে নৃশংসভাবে ওই আহত মানুষগুলোকে হত্যা করা হলো।
আমাদের আবারও চরের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে যেতেই দেখি চাচা আজিজুল আলমকে। গুলি লেগে তার নাড়িভুঁড়ির অনেকটাই বের হয়ে এসেছে। যন্ত্রণায় তিনি কাতরাচ্ছেন, তবে জ্ঞান তখনো ছিল। রক্তে চারপাশটা ভেসে যাচ্ছে। ওই অবস্থাতেই প্রতিবাদ করে চাচা ক্যাপ্টেনকে চেঁচিয়ে বলছিলেন, “ইয়ে কিয়া জুলুম হ্যায় ভাই! ইয়ে কিয়া জুলুম হ্যায়! খোদাতালা বরদাশত নেহি কারেগা।” কথাগুলো পরপর তিনবার বললেন তিনি।
শুনে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন গর্জে উঠল। “শুয়োর কা বাচ্চা” বলেই চাচার খুব কাছে গিয়ে কপালের মাঝ বরাবর একটা গুলি করল। মাথার খুলিটা উড়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা হলো না। খুলিটা উলটে গিয়ে গোটা মুখটাই ঢেকে গেল। তিনি তখন শুধু একবার ‘উহ্’ শব্দ করলেন। এরপরই উপুড় হয়ে পড়ে গেলেন।
চাচার সেই করুণ মৃত্যুতে বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছিল। ভয়ে শরীর কাঁপছিল, কিন্তু জোরে কাঁদতেও পারছিলাম না। এরপর ওরা আমাদের হুকুম দিল, “তোম সব লাশ এক জাগা করো।”
শেষ নিশ্বাসটা যখন যায়, তখন মানুষ বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করে। লাশের স্তূপ থেকে অনেকেই কিছুটা দূরে সরে গিয়ে পড়েছিল। আমরা লাশগুলো একত্র করতে থাকলাম। মানুষ মারা গেলে যে কতটা ভারী হয়, সেদিন বুঝেছিলাম। দুজন মিলেও একেকটা লাশ তুলতে পারছিলাম না। প্রায় ২০টির মতো লাশ দূর থেকে এনে স্তূপ করে রাখলাম। দেখলাম, অনেকের শরীরে গুলি একদিক দিয়ে ঢুকে আরেক দিক দিয়ে বড় গর্ত হয়ে বের হয়ে গেছে।
খানিক পরে পাকিস্তানি সেনারা একটা লাথি দিতেই আমি লাশের স্তূপের ওপর গিয়ে পড়লাম। সেখান থেকে যখন উঠে এলাম, আমার সারা শরীর তখন শহীদদের রক্তে ভেজা। ওরা পেট্রলভর্তি টিন এনে আমাদের হাতে দিয়ে বলল, “পেট্রোল লাগাও।” গায়ে তখন শক্তি নেই, ভয়ে হাত কাঁপছে, ভালোভাবে পেট্রোল ছিটাতেও পারছিলাম না। পরে ওরাই লাশের স্তূপে পেট্রোল ছিটাল। আমরা পাশেই দাঁড়িয়ে রইলাম।
ক্যাপ্টেন একটু দূরে দাঁড়িয়ে নতুন ম্যাগাজিন ফিট করছিল। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো মানুষকেই সে জীবিত ছাড়বে না। গুলি করে লাশের ওপর ফেলে আমাদেরসহ আগুন ধরিয়ে দেবে। তখন শুধু বিধবা মায়ের কথা মনে পড়ছিল। ছোট ভাই পান্নাকে তো মেরেই ফেলেছে। আমিও যদি মারা যাই, মায়ের কী হবে! তখন সাহস সঞ্চয় করে ওই ক্যাপ্টেনের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইলাম।
যাদের রক্তে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা, স্বাধীন দেশে সেই সব শহীদকেই আমরা ভুলে গেছি! থানাপাড়ায় ওই একদিনে আনুমানিক ১ হাজার ৩০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন। গোটা গ্রামে এমন কোনো পরিবার খুঁজে পাবেন না, যে পরিবারের কেউ শহীদ হয়নি। অথচ বড়ই পরিতাপের বিষয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে আজও তাদের পূর্ণাঙ্গ কোনো তালিকা তৈরি হয়নি।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ২ ডিসেম্বর ২০২৫
© 2025, https:.




