চোখের সামনেই ছাত্রদের লাশ পুড়িয়ে দিল পাকিস্তানিরা

ইকবাল হলের সামনে সেদিন রাতে আসলে কী ঘটেছিল? প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি
মুক্তিযোদ্ধা নাজমা শাহীন বেবীর বাবা আবু জায়েদ শিকদার তখন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। থাকতেন ফুলার রোডের ১৭ নম্বর চারতলা বিল্ডিংয়ের একতলায়। এটি ছিল তৎকালীন ইকবাল হলের (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ঠিক সামনেই। ফলে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাদের হত্যাযজ্ঞ তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন খুব কাছ থেকে।
সেদিনের সেই ভয়াল রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে নাজমা শাহীন শিউরে ওঠেন। তার ভাষায়, “রাত তখন ১০টা হবে। বাড়ির সামনেই মা-খালারা একসঙ্গে গল্প করছে। বান্ধবী ফ্লোরার সঙ্গে আমিও তখন দোলনা আর স্লাইডে খেলছি। দেখলাম ইকবাল হলের ক্যান্টিনটায় কিছু ছাত্র জড়ো হয়েছে। ওরা আবার দৌড়াদৌড়ি করে চলেও গেল।”
এর মধ্যে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আহমদ শরীফ দৌড়ে এসে বাবাকে ডাকতে থাকেন। তখন ফুলার রোড পাড়ার সেক্রেটারি ছিলেন নাজমার বাবা। কী যেন কথা হলো তাদের। এরপর ইংরেজি বিভাগের মুনিম সাহেবের ছেলেকে তারা পাঠালেন ইকবাল হলে। বার্তা একটাই, কোনো ছাত্র যদি সেখানে থেকে থাকে, তারা যেন তখনই হল ছেড়ে চলে যায়। বাবা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। একটা কাগজে কিছু লিখে তিনি দারোয়ানকে দিয়ে পাড়ার প্রতিটি বাড়িতে পাঠান।
নাজমা বলেন, “কাগজে লেখা ছিল- ‘গোলাগুলি শুরু হলে কেউ যেন জানালায় উঁকি না দেয়। ঘরের বাতিও যেন না জ্বলে।’ কিন্তু দারোয়ান চাচা ভয়ে বাসায় বাসায় ওই খবরটা না দিয়েই তার পরিবারের কাছে চলে যান। ফলে আর্মি নামার খবরটা অনেকেই জানতে পারেননি।”
“বাবা আমাদের বললেন, ‘গুলি শুরু হলে বাতি জ্বালাবে না, জানালা দিয়ে উঁকিও দেবে না কেউ।’ কেননা আমাদের দুটি বেডরুমের জানালাই ছিল ইকবাল হলের দিকে।”
“মধ্যরাতে প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হয়। ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। গুলির শব্দে লাফিয়ে উঠি। সবাই ক্রলিং করে মাঝখানের ড্রইংরুমটাতে চলে আসি। সময় দেখার জন্য বাবা একটা ঘড়ি এনে রাখেন। গোলাগুলি তখন বেড়ে যায়। আবার একটু কমেও আসে। এভাবেই চলছিল। পুরো ঘরেই নিস্তব্ধতা। বাবা যে ঘড়িটা এনে রেখেছেন তার টিকটিক আওয়াজটাও আমাদের বুকের মধ্যে এসে লাগছিল।”
গোলাগুলি তখনও চলছে। ট্রেসার গান দিয়ে ওরা ফায়ার করছে, আকাশে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন রঙের আলো। চারপাশে মানুষের আর্তচিৎকার। এক সময় ফজরের আজান হয়। বাড়ির সবাই ভেবেছিলেন, এখন হয়তো ওরা চলে যাবে।
নাজমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “না, দেখা গেল আজানের পর গোলাগুলির মাত্রা আরও বেড়ে গেছে। দু-একটা বাসায় বাতি জ্বালিয়েছিল কেউ কেউ। তা দেখে আর্মিরা বিল্ডিংয়ের দিকে গুলি ছোড়ে।”
ভোরের আলো ফোটার পর কী দেখলেন তারা? নাজমার কণ্ঠে তখন কান্নার রেশ, “ভোরে দেখতে পাই ইকবাল হলের বিভিন্ন রুমে আগুন জ্বলছে। পাকিস্তানি আর্মিরাও হাঁটাচলা করছে। বুঝে গেলাম একটা ভয়াবহ সময় পার করছি আমরা।”
তিনি বলতে থাকেন, “দেখলাম আইন বিভাগের কামরুদ্দিন হোসাইনকে পাকিস্তানি আর্মি বাড়ি থেকে ইকবাল হলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ওনাকে নিয়ে কী করে যাচ্ছে দেখছি। হঠাৎ হল থেকে চিৎকার করে ওঠে চিশতী শাহ হেলালুর রহমান। পাকিস্তানি আর্মি তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক। আমাদের বাড়ির দিকে মুখ করে চিৎকার করে তিনি বলেন, ‘রোজী-বেবি আমাকে বাঁচাও’।”
কিন্তু তখন কিছুই করার ছিল না। পরে চিশতী ভাইয়ের আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। শোনা যায়, অনেকগুলো ডেডবডি নীলক্ষেত পেট্রোল পাম্পের কাছে আর্মিরা জ্বালিয়ে দিয়েছিল। চিশতী ভাইয়ের কথা মনে হলে আজও শিউরে ওঠেন নাজমা।
সকালে অন্যান্য ফ্ল্যাটের সবাই একত্রিত হন। দোতলায় থাকতেন উর্দু বিভাগের অধ্যাপক ড. নাগবি। তিনি আগেই কোথাও চলে গিয়েছিলেন, তাই সব পরিবার ওই বাসাতেই আশ্রয় নেয়। ধারণা ছিল পাকিস্তানি আর্মি এলে হয়তো নন-বেঙ্গলি বাড়িতে ঢুকবে না। এদিকে পাকিস্তানি আর্মিরা জিপ নিয়ে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের ডা. মোর্তজাকে তুলে নিয়ে যায়। ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় ব্রিটিশ কাউন্সিলেও আগুন ধরিয়ে দেয়।
গোলাগুলি চলছিল থেমে থেমে। পরদিন সকালে কারফিউ ভাঙলে বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন, এখানে আর থাকা যাবে না। ফুলার রোডের বাসা থেকে বের হয়ে পলাশীর দিকে যাওয়ার সময় নাজমা শাহীন যে দৃশ্য দেখেছিলেন, তা কোনোদিন ভুলবার নয়।
“দেখি অনেকগুলো ডেডবডি স্তূপ করে মাঠের ভেতর ফেলে রাখা হয়েছে। কতগুলো ডেডবডির নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে গেছে। বেয়নেট চার্জ করে মারা হয়েছিল তাদের। এ দৃশ্য দেখে বুকের ভেতরটা কেঁদে ওঠে। একটা রিকশা পেয়ে আমরা দ্রুত শেখ সাহেব বাজারের দিকে চলে যাই। পরে মুন্সিগঞ্জ হয়ে চলে যাই গ্রামের বাড়ি, কুমিল্লার করিকান্দিতে।”
ইতিহাস কখনও বদলানো যায় না। বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাটিই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। এ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ক্ষেত্রে কখনো আপস করবে না, এমনটাই বিশ্বাস মুক্তিযোদ্ধা নাজমা শাহীনের।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ৬ ডিসেম্বর ২০২৫
© 2025, https:.




