মানুষের মাংস পিঁপড়ার কত পছন্দ, এইডা একাত্তরে বুঝছি

তিন দিন না খেয়ে, পচা ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই– একজন মুক্তিযোদ্ধার ‘বোনাস লাইভ’–এর কাহিনি।
যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ তাজউদ্দিন তখন রণক্ষেত্রে। ঠিক সেই সময় খবর আসে, তাদের গ্রামটি পুড়িয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি সেনারা। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার মানকোন বিনোদবাড়ি গ্রাম। ওইদিন পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করে প্রায় আড়াইশ মানুষকে। এই হত্যাযজ্ঞে সহযোগিতা করে মানকোন গ্রামেরই রাজাকাররা।
রাজাকাররা কাউকে ছাড়েনি। হিন্দু-মুসলিমের ভেদ ছিল না, ছিল না নারী-পুরুষ, বয়স্ক-যুবকের পার্থক্য। যাকে যেখানে পেয়েছে, ধরে তুলে দিয়েছে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে। তাজউদ্দিনদের বাড়িও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রাণ বাঁচাতে তার বাবা-মা পালিয়ে আশ্রয় নেন জয়দায় গ্রামে, নানাবাড়িতে। কিন্তু সে খবর তাজউদ্দিন জানতেন না। লোকমুখে তিনি শুধু শুনেছেন, বাড়ির কেউ আর বেঁচে নেই।
এই ভুল খবরই তার বুকে জ্বালিয়ে দেয় প্রতিশোধের আগুন। যেভাবেই হোক দেশকে স্বাধীন করতেই হবে, এই এক প্রতিজ্ঞায় তিনি একের পর এক অপারেশনে অংশ নেন। কিন্তু এক ভয়াবহ অভিযানে মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হন তিনি।
সেই রক্তাক্ত দিনের কথা বলতে গিয়ে তাজউদ্দিন নিজেই ফিরে যান যুদ্ধের ময়দানে, “ফাইট চলছিল মধুপুর আর ময়মনসিংহের মাঝখানের এলাকায়। ওখানে একটা স্কুলে পাকিস্তানি সেনারা ক্যাম্প করছে। আশ্বিন মাসের আট তারিখ হবে। তিনডা কোম্পানিতে আমরা রাতেই পজিশনে যাই। সকালেই হবে ফাইট। আমাদের কোম্পানিতে একশ জন। আরেক পাশ থাইকা নান্টু কোম্পানি পজিশন নেয়।”
“সবাই প্রস্তুত। নির্দেশ ছিল, অর্ডার দেওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ ফায়ার ওপেন করবে না। আমার স্বাস্থ্য ভালো ছিল। স্যার কইল, ‘এলএমজিটা তোর কাছে রাখ।’ সাইডে স্টেনগানও ছিল। ধানক্ষেতের আইলের ধারে ঘেঁষে পজিশনে ছিলাম। ওদের ক্যাম্পটা একটু উঁচুতে। খুব কুয়াশা ছিল। কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। ফজরের আজান শেষ। দূর থাইকা দেখি, আমার এলাকার রাজাকার আতিক। হাতমুখ ধুইয়া পাকিস্তানিদের সঙ্গে বেঞ্চে বসে আছে। ওরাই আমাদের গ্রামটা জ্বালাইছে। ওকে দেখেই মাথায় রক্ত চড়ে যায়। ঠিক থাকতে পারি না। কমান্ডারের নির্দেশ তখন ভুলে যাই। ব্রাশ ফায়ার করি। আতিকসহ সাত-আটজন পড়ে যায়।”
এই এক মুহূর্তেই শুরু হয় তুমুল গোলাগুলি। পাকিস্তানি সেনারা তাজউদ্দিনকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে থাকে। একটি ছাদের ওপর বাংকার বানিয়ে বসানো ছিল চায়না মেশিনগান। সেখান থেকে বৃষ্টির মতো গুলি আসতে থাকে তার দিকে। পাশে ছিলেন সহযোদ্ধা কাদের। হঠাৎ কাদেরের পায়ে গুলি লাগে, তিনি নড়তে পারেন না। কাদেরকে ধরতে যেতেই টের পান, ডান হাত নড়ছে না। পেছনে তাকিয়ে দেখেন, ধানের আইল রক্তে ভিজে গেছে। তার শরীরে লেগেছে পাঁচটি গুলি। পায়ের ক্ষত তুলনামূলক কম ছিল। একটি গুলি হাতের তালু ভেদ করে কনুইয়ের দিকে ঢুকে শরীরের ভেতরেই আটকে যায়। কখন যে এটা ঘটেছে, তিনি নিজেও টের পাননি।
কিছুক্ষণ পর গোলাগুলি কমলে পিছু হটার নির্দেশ আসে। সবাই পিছিয়ে যায়। কিন্তু তাজউদ্দিন আর কাদের পড়ে থাকেন। শরীর আর চলে না। বহু কষ্টে কাদেরকে নিয়ে একশ-দেড়শ গজ পিছোতেই সাথীরা তাদের তুলে নেয়। যুদ্ধক্ষেত্রে গুলিবিদ্ধ হওয়ার যন্ত্রণা যতটা ভয়াবহ, তার চেয়েও বেশি ভয়ংকর ছিল চিকিৎসার দিনগুলো। সে কথা বলতে গিয়ে বারবার ভিজে ওঠে তাজউদ্দিনের চোখ। বুকের ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের কষ্ট যেন চোখ বেয়ে ঝরে পড়ে।
তিনি বলেন, “মহিষের গাড়িতে কইরা আমগো নেওয়া হয় চাচরি বাজারে। তখনও জ্ঞান ছিল। সারা রাস্তায় হাত দিয়া রক্ত পড়ছিল।” সেই বাজারেই এক ডাক্তার তার হাতে অপারেশন করে আটকে থাকা গুলিটি বের করেন। পোড়া মাংস পরিষ্কার করতে হাতের ভেতর সাড়ে তিন গজ কাপড় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। অসহনীয় সেই যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে তাজউদ্দিন থেমে যান।
বাজারের পাশেই চেয়ারম্যানের বাড়িতে তারা রাত কাটান। কিন্তু রাজাকাররা সে খবরও পৌঁছে দেয় পাকিস্তানি ক্যাম্পে। পরদিন সকালেই সেনারা পুরো বাজার ঘিরে ফেলে। যিনি চিকিৎসা করেছিলেন, সেই ডাক্তারকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। চেয়ারম্যানের স্ত্রী সাহস করে একটি নৌকায় করে তাজউদ্দিন ও তার সহযোদ্ধাকে মাউচ্চা বিলে পৌঁছে দেন। পাহারায় ছিলেন একজন সহযোদ্ধা।
সেদিন প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। ভয় পেয়ে পাহারাদার সহযোদ্ধা বিলের মাঝখানের কচুরিপানার ভেতর তাদের রেখে চলে যান। তিন দিন তাদের কিছু খাওয়া জোটেনি। রক্তক্ষরণে শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যায়। পচা মাংসের গন্ধে কচুরিপানার ভেতর থেকে লাল পিঁপড়া উঠে আসে। তাজউদ্দিন ভাবছিলেন, সেখানেই বুঝি শেষ- “ভাবছিলাম ওইখানেই মারা যামু। চাইর দিন পর সাথীরা নিতে আসে। কিন্তু আর্মিদের গানবোটের টহলের কারণে ওরা আমগো নিতে পারে না।”
এরপর কোনোমতে পাড়ের একটি ছোট ঘরে আশ্রয় নেওয়া হয়। ততদিনে ক্ষত পেকে গেছে। শরীরের দুর্গন্ধে নিজেকেই অসহ্য লাগছিল। সারারাত পিঁপড়া তাড়াতে হয়েছে। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে তার মুখে বেরিয়ে আসে এক বাক্য, “মানুষের মাংস পিঁপড়ার যে কত পছন্দ, এইডা একাত্তরে বুঝছি। ভাবছিলাম পিঁপড়াই আমগো মাইরা ফেলব!”
পরদিন সকালে সাথীরা এসে তাকে পালকির ভেতর শুইয়ে চারপাশে কাপড় প্যাঁচিয়ে নানাবাড়িতে নিয়ে যান। হাতের ক্ষত শুকাতে পরে প্রায় দেড়শ ইনজেকশন নিতে হয়েছে তার শরীরে। তবু তিনি বেঁচে আছেন। নিজের জীবনকে তিনি বলেন, “এইটা বোনাস লাইভ ভাই।”
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ তাজউদ্দিন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যান এক গভীর আহ্বান। তিনি বলেন, “আমাদের যা দায়িত্ব ছিল, করে দিছি। এইবার তোমরা নিজেদের যোগ্যতা দিয়া দেশটারে আগায়ে নিবা। শুধু নিজের স্বার্থের জন্য লোভ কইরো না। মনে রাখবা, এই দেশটাই তোমার সত্যিকারের পরিচয়।”
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
© 2025, https:.




