মুক্তিযুদ্ধ

অক্টোবর ১৯৭১: গেরিলা আক্রমণ আর আন্তর্জাতিক চাপে চিন্তিত পাকিস্তান

পবিত্র কোরআনে রমজানকে রহমতের মাস বলা হয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় মুসলমান হয়েও পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এ দেশীয় দোসরেরা ওই মাসেও তাদের বর্বরোচিত গণহত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন, লুণ্ঠন ও ধর্ষণ অব্যাহত রেখেছিল।

অক্টোবর ১৯৭১। প্রথম তারিখেই বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি উত্থাপিত হয়। নিউ ইয়র্কের চার্চ সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রথম এ দাবিটি উত্থাপন করেন মুজিবনগর সরকারের বিশেষ দূত ও বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতা আবু সাঈদ চৌধুরী। স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশর্ত মুক্তি এবং বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সেনাদের অপসারণের দাবিও করেন তিনি। ফলে বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্ববাসীর নতুন করে ভাবনার সূত্রপাত ঘটে।

এ ঘটনায় আবু সাঈদ চৌধুরীর ওপর ক্ষিপ্ত হয় পাকিস্তানিরা। ৮ অক্টোবর লন্ডনে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরির লক্ষ্যে এক সমাবেশে বক্তৃতা করার সময় তার ওপর হামলা করে প্রবাসী পাকিস্তানিরা। পরে ব্রিটিশ পুলিশ এসে আবু সাঈদ চৌধুরীকে উদ্ধার করে।

এদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ও পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত ক্রমেই জোরালো হতে থাকে। একাত্তরের ৮ অক্টোবর মস্কোতে সোভিয়েত ছাত্র-শিক্ষকেরা এক প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশে তারা বলেন, “এখন বিশ্ববাসীর উচিত বাংলাদেশের বিষয়ে চোখ ফেরানো। পাকিস্তানি সামরিক শাসকেরা বাংলাদেশকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে মেতেছে।” তারা পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা বন্ধ, শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সোভিয়েত সরকারের সমর্থন এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের দাবিও উত্থাপন করেন। এর আগের দিন সোভিয়েত রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বাংলাদেশে চলমান গণহত্যা ও শরণার্থী শিবিরের চিত্র তুলে ধরা হয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের রাজনৈতিক বিতর্কে প্রায় ১০০ দেশের প্রতিনিধি বাংলাদেশ ইস্যুতে বক্তব্য দেয়। তাদের মধ্যে ৫০টি দেশই বাংলাদেশ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। তারা বাংলাদেশ সমস্যার দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান এবং শৃঙ্খলা ফেরানোর কথাও তুলে ধরেন।

ভ্যাটিকানের পোপ জন পলের আহ্বানে অক্টোবরেই রোমের বিভিন্ন গির্জায় বাংলাদেশের জন্য বিশেষ প্রার্থনা সভার আয়োজনের পাশাপাশি উপবাস পালন করা হয়। প্রার্থনাসভায় বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য সংগ্রহ করা হয় অর্থসহযোগিতাও।

১০ অক্টোবর পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একমাত্র ছেলে রাশেদ সোহরাওয়ার্দী লন্ডনে এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে এর সাফল্য কামনা করেন। দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলেন, “বিগত ২৪ বছর ধরে বাঙালিরা অর্থনৈতিকভাবে নিগৃহীত ও রাজনৈতিকভাবে অবদমিত হয়ে আসছে। এখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরিচালিত গণহত্যা এবং অন্যান্য ঘৃণ্য অনাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে। এই সংগ্রাম জয়যুক্ত হবেই।”

১০ অক্টোবর বাংলাদেশের ঘটনাবলির বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘প্রাভদা’ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নেয়। এক প্রতিবেদনে পত্রিকাটিতে বলা হয়, “পূর্ববঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্যাপক ও নৃশংস গণহত্যার দায় এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল হিসেবে পাকিস্তানের প্রশাসন শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার নিয়ে তামাশা করছে। সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে পাকিস্তান সরকার অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করছে।”

প্রাভদায় আরও লেখা হয়, “ন্যায়বিচার লঙ্ঘিত হওয়ায় সোভিয়েত জনগণ বিক্ষুব্ধভাবে এর প্রতিবাদ করছে। তারা শেখ মুজিবুর রহমানের অবিলম্বে মুক্তি, পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান এবং শরণার্থীদের নিরাপদে দেশে প্রত্যাবর্তনেরও দাবি করছে।” (তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ত্রয়োদশ খণ্ড)

এসব ঘটনা পাকিস্তান সরকারকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে এক ধরনের চাপ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করেন মুক্তিযুদ্ধ-গবেষকগণ।

বিশ্ব বিবেক জাগরণ পদযাত্রা

একাত্তরে ভারতে আশ্রয় নেয়া প্রায় এক কোটি বাঙালিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব পড়ে ওই দেশের ইন্দিরা গান্ধী সরকারের ওপর। ভারতের কিছু রাজ্যের মানুষ এতে নাখোশ হয়। শরণার্থীদের ফিরিয়ে দিতে আর মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য না করতে নানাভাবে তারা সরকারকে চাপ দিতে থাকে।

ওই সময়েই পরিকল্পনা হয়, বাংলাদেশ থেকে দিল্লি পর্যন্ত ‘বিশ্ব বিবেক জাগরণ পদযাত্রা’ আয়োজনের। এতে অংশ নেন বিভিন্ন জেলা থেকে আগত বাংলাদেশের ৩৮ জন শিক্ষিত যুবক। ভারত সরকারের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায়, মুজিবের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন স্মারকলিপি প্রদান, পাকিস্তানি সেনা কর্তৃক গণহত্যা ও হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা তুলে ধরে স্বাধীনতার পক্ষে ভারতীয় জনমত গড়ে তোলাই ছিল এর উদ্দেশ্য।

পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে জনসভা করতেন। গণহত্যা সম্পর্কে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আহ্বান জানাতেন বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানোর। ১৫ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে পদযাত্রাটি চলে ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত। দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোতে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হতে থাকে পদযাত্রার খবর। এভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষে ভারতীয়, তথা বিশ্ব জনমত গড়তে ‘বিশ্ব বিবেক জাগরণ পদযাত্রা’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

শান্তিনিকেতনের পথে বিশ্ব বিবেক জাগরণ পদযাত্রার দল (কামরুল আমান-সামনে বাঁ থেকে তৃতীয়)।

পদযাত্রী দলের ডেপুটি লিডার ছিলেন কামরুল আমান। একাত্তরে তিনি নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র ছিলেন। ঐতিহাসিক ওই পদযাত্রার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের সঙ্গে পদযাত্রাটি এগিয়ে নেওয়ার সার্বিক পরিকল্পনায় যুক্ত হয় ‘অখিল ভারত শান্তি সেনা মণ্ডল’ নামের একটি সংগঠন। তাদেরকে সহযোগিতা করে গান্ধী পিস ফাউন্ডেশন। মূল উদ্যোক্তা ভারতের অহিংস সর্বদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ এবং আহ্বায়ক ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের দীনেশ চন্দ্র মুখার্জি।

পদযাত্রার আগাম কর্মসূচি ইংরেজি ও হিন্দিতে সংবাদমাধ্যমগুলোতে জানিয়ে দিতেন উদ্যোক্তারা। প্রায় দেড় মাস দলটিকে প্রতিদিন গড়ে ১৫-১৬ মাইল পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে হতো। বিকেলের দিকে স্থানীয়ভাবে আয়োজন করা হতো জনসভার। উঠোন বৈঠকও চলে অগণিত। দেশ-বিদেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে চলে মতবিনিময়ও। এভাবে দলটি মুর্শিদাবাদ, সেইনথিয়া, সুরি, শান্তিনিকেতন, ককশা, দুর্গাপুর, রানীগঞ্জ, আসানসোল, নিয়ামতপুর, কুলটি, চিত্তরঞ্জন ও বিহার, পাটনা, লখনৌ, আগ্রাসহ প্রভৃতি জায়গায় পদযাত্রা করে।

৩০ জানুয়ারি গান্ধী প্রয়াণ দিবসে দিল্লির রাজঘাট গান্ধী সমাধিতে পদযাত্রাটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই স্বাধীনতা লাভ করায় ১৭ ডিসেম্বর ভারতের উত্তরপ্রদেশে এসে সেটি শেষ হয়।”

তিনি আরো বলেন, “আন্তর্জাতিক জাতীয়তাবাদ মানুষের মনের ভেতরই গাঁথা থাকে। কে কোন দেশের, সেটা বড় কথা নয়। মানুষের মুক্তির, মানুষের স্বাধীনতার জন্য মানুষই মানুষের পাশে দাঁড়ায়। একাত্তরে এটাই প্রমাণ করেছিল ভারতীয় জনসাধারণ।”

পদযাত্রার দলটি স্বাধীনতার জন্য একাত্তরে ভারতে হেঁটেছিল ১৪শ’ মাইল। তাদের কাছে ওটাই ছিল মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু দুঃখের বিষয় স্বাধীন দেশে কন্ঠযোদ্ধা বা ফুটবল যোদ্ধাদের ন্যায় ৩৮ জন পদযাত্রীকে এখানো মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি কিংবা কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান দেয়া হয়নি।

শরণার্থী ক্যাম্পে যুবকযুবতীদের লেফটরাইট

একাত্তরে ভারতে শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে কাজ করেছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও। তারা মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যা ও নৃশংতার খবর বিশ্বের কাছে তুলে ধরাসহ ভলান্টিয়াদের মাধ্যমে শরণার্থী ক্যাম্পের যুবক-যুবতীদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দেওয়া ও নানা কাজে যুক্ত রাখত, যাতে কোনোভাবেই তারা বিপথগামী হয়ে না যায়। একাত্তরে এ দুটো কাজই ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তেমনই কাজ করেছিল ‘বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার সার্ভিস কোর’ নামের একটি সংগঠন। এর উদ্যোক্তা ছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম। লন্ডনের ওয়ার অন ওয়ান্ট তাদের ফান্ড দিতো। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য ডোনাল্ড চেসওয়ার্থ ছিলেন ওয়ার অন ওয়ান্ট-এর চেয়ারম্যান। এ সংগঠনেই ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন যুদ্ধ-আলোকচিত্রী ও মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদ রায়হান। তার বাড়ি কুষ্টিয়া শহরে।

ভলান্টিয়াররা শরণার্থী ক্যাম্পের যুবক-যুবতীদের ট্রেনিং করাচ্ছেন। ছবি: আবদুল হামিদ রায়হান

বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার সার্ভিস কোরের দল যখন যে জায়গায় যেত, তাদের সঙ্গেই যেতে হতো হামিদ রায়হানকে। অক্টোবর থেকে বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে গিয়েও ছবি তুলছেন তিনি। পাটগ্রামের মুক্ত এলাকা পরিদর্শন করতে এসেছিলেন ওয়ার অন ওয়ান্টের চেয়ারম্যান ডোনাল্ড চেসওয়ার্থ। ১৯৭১ সালের ১ অক্টোবর ডোনাল্ড চেসওয়ার্থসহ পাটগ্রামের কোর্ট-কাচারি, হাসপাতাল ও বিভিন্ন জায়গায় ছবি তোলেন হামিদ রায়হান। এ ছাড়া তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন ট্রেনিং ক্যাম্প, শরণার্থী ক্যাম্প ও মুক্তাঞ্চলগুলোয়। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ধ্বংস করা ব্রিজ, কালভার্ট ও ভবনের ছবিও উঠে এসেছে তার ক্যামেরায়।

একাত্তরে বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার সার্ভিস কোরের সদস্যরা। ছবি: আবদুল হামিদ রায়হান

শরনার্থী ক্যাম্পের বর্ণনা দিতে গিয়ে এই আলোকচিত্রী বলেন, “খুব কাছ থেকে দেখেছি কীভাবে মানুষ মারা যাচ্ছে। অভুক্ত অবস্থায় মানুষ আসছে দেশ (পূর্ব পাকিস্তান) থেকে। তিন-চার দিন পর মেলে তাদের খাবার। আবার কলেরা শুরু হয়ে গেল। শরণার্থী ক্যাম্পগুলোয় চোখের একটা অসুখ দেখা দেয় তখন। চোখের ওই রোগ মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল সব ক্যাম্পে। ফলে পশ্চিম বাংলার লোকেরা ওই রোগের নাম দেয় ‘জয় বাংলা রোগ’। এক শরণার্থী ক্যাম্পে দেখেছি, মা মরে গেছে, বাচ্চা গিয়ে তার দুধ খাচ্ছে। এই ছবিটা তুলতে না পারায় আজও খুব আফসোস হয়।”

মোনায়েম খান নিশ্চিহ্নকরণ অপারেশন

এদিকে অক্টোবরের ১৩ তারিখে দেশের অভ্যন্তরে গেরিলাদের এক অপারেশন চিন্তায় ফেলে দেয় পাকিস্তানি সামরিক সরকারেকে। পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর আবদুল মোনেম খান ওরফে মোনায়েম খান ছিলেন পাকিস্তানি সামরিক শাসক আইয়ুব খানের ঘনিষ্ঠ সহায়তাকারী। তাই বাঙালিদের কাছে তিনি ছিলেন ঘৃণ্য একজন।

ঢাকার বনানীতে কঠোর নিরাপত্তার আবরণ ভেদ করে বাড়িতে ঢুকে মোনায়েম খানকে হত্যা করেন ঢাকার গেরিলা বীরপ্রতীক আনোয়ার ও বীরপ্রতীক মোজাম্মেল হক। দুই নম্বর সেক্টরের অধীনে তারা ছিলেন ক্যান্টনমেন্ট বিশেষ গেরিলা গ্রুপের সদস্য। ওই অপারেশনে সহযোগিতা করেছিলেন শাহজাহান ও মোখলেস। তারা দুজনই কাজ করতেন মোনায়েম খানের বাসায়।

এই দুর্ধর্ষ অপারেশন সম্পর্কে বীরপ্রতীক আনোয়ার হোসেন বলেন, “মোনায়েম খানের বাড়ির পুরো নকশা তৈরি করি শাহজাহান ও মোখলেসের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। বাড়িটির চারদিকে দেয়াল, ওপরে কাঁটাতারের বেড়াও ছিল। পাকিস্তানি সেনা ও পুলিশ ছিল সার্বক্ষণিক পাহারায়। বাড়ির একটা দেয়ালের মাঝখানটা ভাঙা। তা দিয়ে অনায়াসে একজন ঢুকতে পারবে। ওই সুযোগটিই কাজে লাগাই আমরা।

মোনায়েম খানের বাড়িটি ছিল বনানী কবরস্থান সংলগ্ন। তখন খুব বেশি কবর ছিল না। খুব জংলা ছিল। আমরা জড়ো হব সেখানেই। আরেক সহযোদ্ধা নুরুল আমিনও থাকবে। মোজাম্মেল তার মতো করে পৌঁছে যাবে।

ছোলমাইদে আমাদের অস্থায়ী ক্যাম্প থেকে স্টেনগান নিয়ে আসি ফোল্ড করে, চটের ব্যাগে। গ্রেনেড ও পি-ফোর বোমাও নিই। তারিখটা ১৩ অক্টোবর। সন্ধ্যার পর রওনা হই। অপারেশন হয় আনুমানিক রাত সাড়ে ৮টায়।

ব্যাগ নিয়ে রিকশায় বনানী ব্রিজ পার হয়ে পৌঁছি বনানী কবরস্থানে। মোজাম্মেল ও নুরুল আমিন অপেক্ষায় ছিল।

স্টেনগানটা নিই আমি আর মোজাম্মেলকে দিই হ্যান্ড গ্রেনেডটা। ফায়ার করার পরেও যদি কোনো সমস্যা হয়, তাহলে গ্রেনেড ছোঁড়া হবে। এমনটাই ছিল পরিকল্পনা।

কবরস্থানের দেয়ালঘেঁষা মোনায়েম খানের বাড়ির দেয়ালের ভাঙা অংশ দিয়ে ভেতরে ঢুকি আমরা। অতঃপর কলাগাছের বাগানে অপেক্ষায় থাকি।

শাহজাহান এসে বলে, ‘আপনারা এখানেই বসেন। সাহেব এখনো ওপর থেকে নামেন নাই।’

১০ মিনিট পরেই সে ফিরে এসে বলে, ‘সাহেব নামছে।’

মোনায়েম খানের পজিশনটা জানতে চাইলাম। সে বলে, পশ্চিম দিকে মুখ করা তিনজন লোকের মাঝখানেই সাহেব বসা।

স্টেনগান নিয়ে নীচতলায় ড্রইংরুমের দরজা ঠেলে ঢুকে যাই। মাত্র ১৫ ফিট সামনে তারা। মাঝের ব্যক্তিকে টার্গেট করেই গুলি করি। সঙ্গে সঙ্গে মোনায়েম খান উপুড় হয়ে পড়ে যান, একটা চিৎকারও দেন। এইটুকু এখনো স্মৃতিতে আছে।

পেছনে ব্যাক করতেই মোজাম্মেল সঙ্গে সঙ্গে গ্রেনেড চার্জ করে। কিন্তু তার গ্রেনেডটা কোনো কারণে বার্স্ট হয়নি। পরে শুনেছি মোনায়েম খানের সঙ্গে (দুই পাশে) ছিল প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী আমজাদ হোসেন আর মেয়েজামাই জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল।

মোনায়েম খান মারা গেছেন—এটা জানি পরদিন, রেডিওর সংবাদে। আশপাশের লোকেরা আলাপ করছিল, ‘মোনায়েম খানরে মুক্তিযোদ্ধারা মাইরা ফেলছে।’ সারা পৃথিবীতেও ছড়িয়ে পড়ে খবরটি।”

মোনায়েম খানের হত্যার খবরে তৎকালীন মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ এবং ডা. এ এম মালিকের মন্ত্রিসভার মন্ত্রীদের মনোবাল দারুণভাবে ভেঙ্গে পড়ে। অনেকেই গোপন বৈঠক করে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগেরও ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল বলেও শোনা যায়। মুক্তিবাহিনীর ভয়ে সাবেক গভর্নরের শেষকৃত্যেও উপস্থিত হননি অনেক নেতা। শুধু তাই নয়, এ ঘটনার পর পাকিস্তান সরকারের উর্ধ্বতন বেসামরিক কর্মকর্তারাও অফিসে যাওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেন।

এ ঘটনা পাকিস্তান সরকারকে ব্যাপক চিন্তায় ফেলে দেয়। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল আরও দৃঢ় হওয়ার পাশাপাশি এ ঘটনা স্বাধীনতার পক্ষে সাধারণ মানুষকেও ঐক্যবদ্ধ করেছিল।

রমজান মাসেও বন্ধ হয়নি গণহত্যা

একাত্তরে অক্টোবরের শেষের দিকে শুরু হয় রমজান মাস। পবিত্র কোরআনে রমজানকে রহমতের মাস বলা হয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় মুসলমান হয়েও পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এ দেশীয় দোসরেরা ওই মাসেও তাদের বর্বরোচিত গণহত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন, লুণ্ঠন ও ধর্ষণ অব্যাহত রেখেছিল।

২৫ অক্টোবর ছিল চতুর্থ রমজান। ওইদিন টাঙ্গাইলের নাগরপুরের গয়াহাটা ইউনিয়নের বনগ্রামে লুটপাট-ধর্ষণ শেষে পৈশাচিক গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। এ গণহত্যায় শহীদ হয় শিশু, নারী, বৃদ্ধসহ নিরীহ ৫৭ জন গ্রামবাসী। পুড়িয়ে দেয়া হয় তাদের ১২৯টি বাড়িও।

কুড়িগ্রামের রাজিবপুর থানার কোদালকাঠি ইউনিয়নের শংকর মাধবপুর গ্রামে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় ওই একই তারিখে হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনারা। এতে অর্ধশতাধিক গ্রামবাসী শহীদ হন। সিলেটের গোপালগঞ্জ থানার পশ্চিম আমুড়া ইউনিয়নের সুন্দিশাইলেও পৈশাচিক গণহত্যা চালিয়ে ২৩ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে তারা। এমন গণহত্যা ও নির্যাতন চলে গোটা রমজান মাস জুড়েই। (তথ্যসূত্র: গণহত্যা’৭১-তপন কুমার দে, যুদ্ধ ও নারী-ডা. এম এ হাসান, স্বাধীনতা’৭১-বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম)

অক্টোবর থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পিত আক্রমণ আরও তীব্রতর হতে থাকে। সীমান্তবর্তী এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপগুলোর সরাসরি সশস্ত্র আক্রমণ এবং দেশের অভ্যন্তরে মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা গেরিলাদের আক্রমণে দিশেহারা হতে থাকে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসররা। একদিকে গেরিলা আক্রমণে সাবেক গভর্নরকে হত্যা অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপে চিন্তার ভাজ পড়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ললাটে।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে, প্রকাশকাল: ১১ অক্টোবর ২০২৫

© 2025, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button