স্বীকৃতিহীন শহীদ: একাত্তরের এক গোয়েন্দা পুলিশের বীরগাথা

পরদিন সকালে কারফিউ উঠে গেলে বাচ্চু গিয়ে দেখেন, তার বাবার পায়ের বুড়ো আঙুলটি তখনো মাটির উপরে বের হয়ে আছে।
ইতিহাসে তার নাম নেই, গেজেটের তালিকায় ঠাঁই হয়নি। অথচ রাজশাহীর পুলিশ লাইন্সে একটি ব্যারাক আজও তার স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে। রাষ্ট্রের খাতায় তিনি আজও ‘অজ্ঞাত’, কিন্তু পরিবারের কাছে তিনি সেই বীর, যিনি পলায়নের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সহকর্মীদের বিপদে ফেলে সরে যাননি। রক্তমাখা চশমা আর আইজিপির স্বাক্ষর করা এক টুকরো সনদ ছাড়া এই বীর শহীদের আর কোনো রাষ্ট্রীয় পরিচয় জুটেনি দীর্ঘ ৫৪ বছরেও।
একাত্তরের এই গোয়েন্দা পুলিশ হলেন শহীদ আজিজুর রহমান। রক্তঝরা দিনগুলোর স্মৃতি আজও অমলিন তার ছেলে আমিনুর রহমান বাচ্চুর হৃদয়ে। বাচ্চুর বাবা আজিজুর রহমান তৎকালীন রাজশাহী শহরে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের (সিআইবি) অ্যাসিস্ট্যান্ট সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স অফিসার (ইন্সপেক্টর র্যাংক) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পাকিস্তান সরকারের চাকরি করলেও তিনি মনেপ্রাণে ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষে। রাজশাহীর নেতা এ এইচ এম কামারুজ্জামান ছিলেন আজিজুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আরেক বন্ধু ছিলেন সে সময়ের নামকরা ধনী ব্যক্তি মোসলেম কন্ট্রাক্টর। মোসলেম কন্ট্রাক্টরের বৈঠকখানায় বসেই তারা নিয়মিত আড্ডায় মিলিত হতেন। গোয়েন্দা বিভাগে থাকার সুবাদে আজিজুর রহমানের কাছে আসত নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা তিনি নিয়মিত পৌঁছে দিতেন কামারুজ্জামানকে। তৎকালীন আন্দোলনের জন্য এই তথ্যগুলো ছিল সহায়ক।
পরবর্তীতে এই খবরই পৌঁছে যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কানে। ফলে আজিজুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে তারা। সেই স্মৃতি আজও তার সন্তানের চোখে জীবন্ত। মনে হলেই বড় কষ্ট হয়। আমিনুর রহমান বাচ্চু বলেন, “একাত্তরে আব্বার মৃত্যুটাকে আমি বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যা বলব, কখনোই সেটাকে সাধারণ মৃত্যু বলব না!”
শহীদ আজিজুর রহমানকে নিয়ে এভাবেই আলাপচারিতা শুরু করেন তার সন্তান আমিনুর রহমান বাচ্চু। তাদের বাড়ি রাজশাহী শহরের বোয়ালিয়া থানাধীন সাগরপাড়ায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাচ্চুর বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর।
২৫ মার্চ ১৯৭১। রাতে পাকিস্তানি সেনারা ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আক্রমণ করে, কিন্তু সেখানেই তারা প্রথম প্রতিরোধের মুখে পড়ে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম অস্ত্র তুলেছিলেন পুলিশ সদস্যরা। এই কারণেই সারাদেশে পুলিশের ওপর পাকিস্তানি সেনারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। রাজশাহীও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ২৬ মার্চ সকাল থেকেই রাজশাহী শহরে ছাত্র-জনতা ব্যারিকেড দিতে শুরু করলে পুলিশ সদস্যরাও সাদাপোশাকে তাদের সাহায্য করেন। পুলিশ লাইনসটি ছিল শহরের পশ্চিম দিকে, ভেড়িপাড়া মোড়ে নদীর পাড়ে।
২৮ মার্চ দুপুরবেলা। পুলিশ সদস্যরা তখন খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই পাকিস্তানি সেনারা অতর্কিতে মর্টার ও ভারী মেশিনগান দিয়ে আক্রমণ চালায়। শুরু হয় উভয়পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি। একসময় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকের অরক্ষিত এলাকা দিয়ে পুলিশ লাইনে ঢুকে পড়ে সেনারা। তখন বহু পুলিশ সদস্য অস্ত্র ও গুলিসহ পুলিশ লাইন ছেড়ে সরে পড়েন। ভয়াবহ ওই প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ হন ১৯ জন পুলিশ সদস্য।
তারপর শহরে পাকিস্তানি সেনাদের হত্যাযজ্ঞ চলতেই থাকে। পরে বাঙালি ইপিআর সদস্য, পুলিশ সদস্য ও সকল স্তরের জনতা সম্মিলিতভাবে আক্রমণ চালিয়ে ক্যান্টনমেন্ট ঘিরে রাখে। সেখানে কিছু পাকিস্তানি সেনাও হতাহত হয়। ‘রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টে আটকা পড়েছে বহু সেনা’, এই খবর পৌঁছে যায় ঢাকায়। তাদের উদ্ধারের জন্য ঢাকা থেকে রওনা হয় শক্তিশালী পাকিস্তানি সেনাদল। তারা নগরবাড়ি ও নাটোর হয়ে সব প্রতিরোধ গুড়িয়ে হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে রাজশাহীর দিকে অগ্রসর হয়। ১৩ এপ্রিলে তারা রাজশাহীর দখল নেয়। এর পরদিনই হত্যা করা হয় আজিজুর রহমানকে।
সেই হত্যাযজ্ঞ খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন আমিনুর রহমান বাচ্চু। তার ভাষায় শোনা যাক সেদিনের আদ্যোপান্ত: “তৎকালীন সিআইবি অফিসের অবস্থান ছিল রাজশাহী শহরের জিরো পয়েন্টের কাছে সাহেব বাজারে, একটি পুরাতন জমিদার বাড়িতে। অফিসে ঢুকতেই দুটো বাউন্ডারি পড়ে- একটা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলে রিসিপশন ও গার্ডের ব্যারাক, এরপর কিছুটা উঁচু জায়গায় আরেকটি গেট পেরোলেই ছিল অফিস রুমগুলো।”
“তখন আব্বার অফিসেই একটি রুমে সবাই গাদাগাদি করে থাকতাম। দেশের অবস্থা খারাপ হওয়ায় সব অফিসারই তাদের পরিবারকে সেখানে নিয়ে এসেছিলেন। ১৩ এপ্রিল রাত থেকেই খবর রটে যায় পাকিস্তানি আর্মি আসছে। সবাই চরম আশঙ্কায় রাত কাটান। অফিসের পাশেই মেইন রোড; অফিসের ছাদে উঠলে রাস্তার সবকিছু দেখা যেত। প্রতিরোধকারী বাঙালিরাও তখন রাস্তা থেকে সরে যাচ্ছেন।”
১৪ এপ্রিল সকাল তখন আনুমানিক ৮টা। অফিসের বাইরের গেটে প্রচণ্ড আওয়াজ। বুট দিয়ে গেটে লাথি মারতে থাকে পাকিস্তানি সেনারা। সবাই ভয়ে তটস্থ। এর মধ্যেই গেট ভেঙে তারা ভেতরে এগোতে থাকে। সবাই সিদ্ধান্ত নেয় গেট খুলে দেওয়াই ভালো হবে, নতুবা তারা আরও হিংস্র হয়ে উঠবে। সিআইবি অফিসের প্রধানের একজন বিহারী পিয়ন ছিলেন, উর্দু জানতেন। তাকে গেট খোলার জন্য পাঠানো হলো।
তিনি গেট খুলতেই অস্ত্র উঁচিয়ে পাকিস্তানি সেনারা ভেতরে ঢোকে। তারা অফিস রুমগুলো তছনছ করে এবং পরিবারগুলোর আশ্রয় নেওয়া ঘরে ঢুকে টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার লুট করতে থাকে। কেন সরকারি অফিসে ঢুকে এমনটা করা হচ্ছে? এ নিয়ে ডিএসপি খলিলুর রহমান প্রতিবাদ জানালে সেনারা তাকে ‘গাদ্দার’ বলে গালি দেয়। বুটের লাথি ও রাইফেলের বাটে নির্যাতন করে রক্তাক্ত অবস্থায় সিঁড়ির নিচে ফেলে রাখে। পরবর্তীতে একদিন এসে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
বাচ্চু বলেন, “আম্মা তখন আব্বাকে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও তিনি রাজি হলেন না। বললেন, এভাবে সবাইকে ফেলে তিনি যাবেন না। খানিক পরেই পানি খাওয়ার কথা বলে তিনি ঘরে আসেন। অফিসের অস্ত্রাগারের দায়িত্ব ছিল আব্বার ওপর। চাচা শফিকুর রহমান (পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সদস্য) আব্বাকে একটি কম্বিনেশন লক উপহার দিয়েছিলেন, যা দিয়ে তিনি অস্ত্রাগার আটকে রেখেছিলেন। এমন মজবুত তালা দেখে পাকিস্তানি আর্মিদের সন্দেহ বেড়ে যায়। তারা চাবি চাইলে পিয়ন কশিমুদ্দিন আব্বাকে ডেকে আনেন।”
“সে সময় বড় বোন লায়লা পারভীন বানু (যিনি পরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন) আব্বাকে পানি খাওয়াচ্ছিলেন। পিয়নের ডাকে আব্বা অস্ত্রাগারের দিকে গেলে পেছন পেছন আমিও যাই। পাকিস্তানিরা অস্ত্রাগারের সব অস্ত্র বেঁধে ট্রাকে তুলে নেয়।”
“অতঃপর সবাইকে লাইন করে দাঁড় করানো হয়। সেখানে সাতজন ছিলেন- অফিসার তিনজন (আব্বা, আজিজুল হক ও খন্দকার আবু আকতার) এবং খন্দকার সাহেবের এক শ্যালকসহ বাকিরা। সেনারা যখন আব্বাসহ সবাইকে নিয়ে যাচ্ছিল, আমি পেছন পেছন ছুটছিলাম। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর এক পাকিস্তানি সেনা আমাকে চড় মেরে সরিয়ে দেয়। আমি লুকিয়ে আবার আব্বার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করতেই সাবমেশিন গানের ব্রাশফায়ারের শব্দ শুনি। বুকের ভেতরটা তখনই খামচে ধরে।”
সাতজনের মধ্যে দুজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। বাকি পাঁচজনকে মেইন গেটের সামনের বড় মাঠে বসিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়। আজিজুর রহমানের মাথায়, বুকে ও পেটে গুলি লেগেছিল। তিনি ছাড়াও শহীদ হন খন্দকার আবু আকতার। আরেক সহকর্মী আজিজুল হক ঘাড়ের পাশ দিয়ে গুলি বেরিয়ে যাওয়ায় বেঁচে যান। খন্দকারের শ্যালকের পেটে ও পায়ে গুলি লাগে। সেনারা চলে যাওয়ার পর তারা কোনোমতে অফিসের ভেতরে আসেন। বড় বোন লায়লা পারভীন বানু তখন বাবার মৃত্যুর শোক বুকে চেপে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা করেন। কশিমুদ্দিন পরে গিয়ে আজিজুর রহমানের নিথর দেহ ও পাশে পড়ে থাকা রক্তমাখা চশমাটি দেখে আসেন।
কারফিউর কারণে কেউ লাশ দাফন করতে সাহস পায়নি। এমনকি অনেকে পরামর্শ দেন লাশগুলো ওভাবেই পড়ে থাকুক, যাতে নতুন কোনো সেনাদল এসে মনে করে এখানে অপারেশন হয়ে গেছে এবং ভেতরে আর হামলা না চালায়। ফলে লাশ দুটো তখন অন্য সবার জন্য এক প্রকার ‘প্রটেকশন’ হিসেবে পড়ে ছিল। দোতলার ছাদে দাঁড়িয়ে বাচ্চু দেখলেন, চেক লুঙ্গি আর সাদা পাঞ্জাবি পরা তার বাবার নিথর দেহটি অবহেলায় পড়ে আছে।
সেদিন রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হলো। বাচ্চুর মনে হয়েছিল এটি বৃষ্টি নয়, যেন শহীদের লাশের গোসল। ১৫ এপ্রিল রাতে সেনারা এসে বড় একটি গর্ত খুঁড়ে লাশ দুটো কোনোমতে মাটিচাপা দেয়। পরদিন সকালে কারফিউ উঠে গেলে বাচ্চু গিয়ে দেখেন, তার বাবার পায়ের বুড়ো আঙুলটি তখনো মাটির উপরে বের হয়ে আছে। পরবর্তীতে সেই কবরটি সংস্কার করা হলেও আজও সেখানে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়নি।
শহীদ আজিজুর রহমানের আত্মত্যাগের এত সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও স্বাধীন দেশে তিনি পাননি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। আইজিপি আব্দুল খালেক স্বাক্ষরিত মৃত্যুসনদ এবং পুলিশ স্মৃতি জাদুঘরে সংরক্ষিত তার পোশাক ও রক্তমাখা চশমা আজও তার বীরত্বের সাক্ষ্য দিচ্ছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে রাজশাহী পুলিশ লাইনে একটি নারী ব্যারাকের নামকরণ করা হয়েছে ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ পরিদর্শক আজিজুর রহমান নারী ব্যারাক’।
এই স্বীকৃতির জন্য কৃতজ্ঞ হলেও আমিনুর রহমান বাচ্চু আক্ষেপ করে বলেন, “আব্বা বা আমাদের পরিবারের আত্মত্যাগের কথা আজও ইতিহাসের তালিকায় ওঠেনি। পুলিশ বা গোয়েন্দা বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।”
যাদের জীবনের বিনিময়ে আমরা এই মানচিত্র পেয়েছি, তাদের ত্যাগের সঠিক ইতিহাস প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শহীদ আজিজুর রহমানের মতো বীরদের নাম যেন কেবল ব্যারাকে নয়, ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা থাকে।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
© 2026, https:.




