
সিরাজুল এক হাতে জয়নালকে টানছিলেন আর অন্য হাতে সমানে গুলি চালাচ্ছিলেন।
একাত্তরের রণক্ষেত্রের সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার শরীফপুর গ্রামের মো. সিরাজুল ইসলামকে। তার ডান হাতটি এখন সম্পূর্ণ অকেজো, যেন এক জীবন্ত ক্ষতচিহ্ন। উনিশ বছরের সেই টগবগে তরুণ আজ বয়সের ভারে নুইয়ে পড়লেও শরীরের প্রতিটি আঘাতের দাগ যেন একেকটি মহাকাব্য।
কেবল ডান হাত নয়, বাঁ পায়ের পাতায়ও বিঁধেছিল শত্রুর বুলেট। সেই রক্তঝরা দিনের গল্প বলতে গিয়ে আজও তার চোখে ভেসে ওঠে হারানো সহযোদ্ধাদের মুখ আর বিজয়ের অদম্য নেশা।
পাকিস্তানি হানাদারদের অত্যাচারের মুখে ঘরে বসে থাকা সম্ভব ছিল না সিরাজুলের পক্ষে। তার মনে হয়েছিল, মরতে যদি হয়ই, তবে লড়াই করেই মরবেন। এই সংকল্প থেকে বন্ধু দোলন মিয়াকে নিয়ে তিনি ঘর ছাড়েন। পথে তাদের সঙ্গী হন সাত্তার। বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে তারা করিমপুর, দইসিদ্ধি হয়ে পৌঁছান পাতারিয়া বাজারে। এরপর অবতপুর গ্রাম আর মইলাম বাজার পার হয়ে তারা সীমানা পেরিয়ে মেঘালয়ের বালাটের লালপানিতে পৌঁছান। সেখানেই শুরু হয় এক নতুন জীবনের মহড়া।
প্রশিক্ষণের জন্য সিরাজুলদের পাঠানো হয় চেরাপুঞ্জির ইকো ওয়ান ক্যাম্পে। তিনি ছিলেন ৫ নম্বর ব্যাচের অন্তর্ভুক্ত, যার ব্যাচ কমান্ডার ছিলেন বীরবিক্রম জগৎজ্যোতি দাস। ১৯৭১ সালের পহেলা এপ্রিল শুরু হওয়া সেই প্রশিক্ষণ শেষ হয় পহেলা মে। এরপর শিলং ক্যান্টনমেন্টে পাঁচ দিনের আর্টিলারি প্রশিক্ষণ নেন তিনি। জাতীয় পতাকা আর পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে নেওয়া সেই শপথে সেদিন উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল আতাউল গণি ওসমানী।
মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম যুদ্ধ করেছেন ৫ নম্বর সেক্টরের অধীনে, যার সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্নেল মীর শওকত আলী এবং সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর এম এ মোতালিব। ছাতকের টেংরাটিলা, সুনামগঞ্জের দোয়ারবাজার, জয়কলসবাজার, আমবাড়ি, ছফেরগাঁও, বৈশারপাড় ও মঙ্গলকাটাবাজারের মতো উত্তপ্ত রণক্ষেত্রে বীর বিক্রমে লড়েছেন তিনি।
দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৭ নভেম্বর। মঙ্গলকাটাবাজারে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প, যেখানে রাখা হতো আর্টিলারি, বোমা আর রসদ। ছফেরগাঁও বনগ্রাম ছিল তাদের সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার। বৈশারপাড় তখন পাকিস্তানি সেনাদের কবজায়। মুক্তিযোদ্ধাদের এ, বি এবং সি- এই তিনটি কোম্পানির লক্ষ্য ছিল বৈশারপাড় পুনরুদ্ধার করা।
রণাঙ্গনের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে সিরাজুল জানান, তাদের ১৩টি বাংকার ছিল। কিন্তু পাকিস্তানিদের আর্টিলারি হামলায় বাংকারগুলো তছনছ হয়ে যায়। আগের রাতে নদী পার হতে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে শহীদ হন সহযোদ্ধা কালা। অবস্থা বেগতিক দেখে সিরাজুলরা ছফেরগাঁও হেডকোয়ার্টারের দিকে পিছিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন।
ফজরের ওয়াক্তে পাকিস্তানি সেনারা খুব কাছ থেকে ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান দিচ্ছিল। সিরাজুল তার সহযোদ্ধা জয়নাল ও জয়দেবকে এগোতে বলে পেছন থেকে কাভারিং ফায়ার দিতে থাকেন। নদী পার হওয়ার সময় হঠাৎ একটি গুলি সিরাজুলের বাঁ পায়ের পাতা ভেদ করে চলে যায়। তীব্র যন্ত্রণায় তার মনে হয়েছিল কোনো বিষধর সাপ বুঝি তাকে দংশন করেছে, কিন্তু যুদ্ধের উন্মাদনায় তিনি তা গ্রাহ্য করেননি।
সকাল ৮টার দিকে হঠাৎ জয়নাল গুলিবিদ্ধ হয়ে আইলের পাশে পড়ে গোঙাতে থাকেন। সিরাজুল এক হাতে জয়নালকে টানছিলেন আর অন্য হাতে সমানে গুলি চালাচ্ছিলেন। মাত্র ১৩-১৪ গজ সামনে তখন পাকিস্তানি সেনারা। তারা গালিগালাজ করে সিরাজুলকে আত্মসমর্পণ করতে বলে। সেই গালি শুনে সিরাজুলের মাথায় রক্ত চড়ে যায়।
তিনিও পাল্টা জবাব দিয়ে ব্রাশফায়ার করেন এবং তার গুলিতে এক শত্রু সেনা খতম হয়। কিন্তু পরক্ষণেই একটি গুলি তার এলএমজির ডাঁট ভেঙে ডান হাতের পেশিতে ঢুকে হাড়সহ মাংস উড়িয়ে নিয়ে যায়। শরীরের রক্ত কাদাপানিতে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল, হাত দিয়ে গলগলিয়ে পড়ছিল রক্ত। কিন্তু উত্তেজনায় সিরাজুল তখনো টের পাননি তার হাতটির করুণ দশা।
সকাল ৯টার দিকে জঙ্গল দিয়ে সরে যাওয়ার সময় সিরাজুল দেখেন, বেঙ্গল রেজিমেন্টের মজিবুর রহমানকে ৮-১০ জন পাকিস্তানি সেনা বন্দি করে নিয়ে যাচ্ছে। নিজের জীবনের মায়া ছেড়ে তিনি মজিবকে সতর্ক করে পজিশন নিতে বলেন। কিন্তু এলএমজির ট্রিগার চাপতে গিয়ে দেখেন আঙুল চলছে না। তাকিয়ে দেখেন, হাতের মাংস ও রগ সব ছিঁড়ে ঝুলে আছে, হাড় বেরিয়ে আছে।
কিন্তু বিচলিত না হয়ে তিনি বাঁ হাতের আঙুল চেপে ট্রিগার টানলেন। তার নিখুঁত নিশানায় শত্রু সেনারা লুটিয়ে পড়ল এবং সেই সুযোগে মজিবুর রহমান প্রাণে বেঁচে যান। সারাদিন জঙ্গলে পোকামাকড়ের কামড় আর অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে পড়ে রইলেন সিরাজুল। চোখে পানি আসছিল, বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ছিল, কিন্তু মুখ ফুটে শব্দ করার উপায় ছিল না।
সন্ধ্যার পর বহু কষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে নদী সাঁতরিয়ে তিনি হেডকোয়ার্টারে পৌঁছান। সেখান থেকে তাকে বালাট ও পরে শিলং হাসপাতালে নেওয়া হয়। টানা সতেরো দিন জ্ঞানহারা ছিলেন তিনি। সেদিন তাদের ইউনিটের মোট ৪৮ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন।
অকেজো হাত আর যুদ্ধজয়ের গৌরব নিয়ে সিরাজুল ইসলাম আজও বেঁচে আছেন। নতুন প্রজন্মের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস। তিনি চান, তরুণরা যেন দেশের জন্য সততার সঙ্গে কাজ করে এবং সর্বদা স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তিতে অবিচল থাকে। স্বাধীনতাবিরোধীদের বিষয়ে সর্বদা সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “তবেই এ দেশ সার্থক হবে।”
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১৭ মার্চ ২০২৬
© 2026, https:.




