মুক্তিযুদ্ধ

দেশটাকে কখনও খাটো করে দেখো না: মুক্তিযোদ্ধা আজাদ

ক্ষতচিহ্নের গদ্য, পর্ব ৫

মুক্তিযুদ্ধে মাইন বিস্ফোরণে উড়ে যায় আজাদ আলীর বাঁ হাতের কবজির নিচের অংশ।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার কুশাবাড়িয়া গ্রাম। একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চে এই গ্রামেরই এক টগবগে যুবক ছিলেন মোহাম্মদ আজাদ আলী। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে কলম ছেড়ে তাকে ধরতে হয়েছিল মশাল।

একাত্তরের ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের পর চারপাশের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। গ্রামের আবদুস সাত্তার মাস্টার আর সোলেমানদের নিয়ে গঠিত হয় সংগ্রাম কমিটি। মিছিল আর মশাল জ্বালানোর গুরুদায়িত্ব পড়ে তরুণ আজাদের কাঁধে।

মুক্তির নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা ২৫-৩০ জন যুবক স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন শমসের আলী ও মহসীনের মতো কয়েকজন আনসার সদস্য। আধুনিক কোনো অস্ত্র নয়, তখন তাদের একমাত্র ভরসা ছিল হাতের লাঠি। যদিও সেই প্রশিক্ষণে সরাসরি যুদ্ধে খুব একটা কাজে আসেনি, তবে তা তাদের মনে বুনে দিয়েছিল প্রতিরোধের অদম্য সাহস।

২৫ মার্চের কালো রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। বাদ যায়নি রাজশাহীও। গোপালপুর সুগারমিলে ক্যাম্প গেড়ে পাকিস্তানি সেনারা শুরু করে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। প্রতিরোধের তাড়নায় অস্থির হয়ে ওঠেন আজাদ আলীরা। তাদের হাতে তখন অস্ত্র বলতে কেবল কোচ, বল্লম, দা, কাঁচি আর লাঠি।

মে মাসের ৬ ও ৭ তারিখের এক ঘটনা তাদের যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেয়। সুগার মিল থেকে রেললাইন ধরে পাকিস্তানি সেনাদের একটি ব্যাটালিয়ন রাজশাহীর দিকে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে পানি খাওয়ার তৃষ্ণায় কয়েকজন সেনা দলছুট হয়ে গ্রামে ঢুকলে ওত পেতে থাকা গ্রামবাসী ও মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। আড়ানি ও গোচর গ্রামে সেদিন প্রাণ হারায় সাত-আটজন পাকিস্তানি সেনা।

কিন্তু আজাদ আলী বুঝতে পারছিলেন, শুধু দেশি অস্ত্র দিয়ে আধুনিক সেনাবাহিনীর সঙ্গে বেশিক্ষণ পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামরিক প্রশিক্ষণ ও আধুনিক মারণাস্ত্র। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি পা বাড়ালেন নিরুদ্দেশের পথে।

মে মাসের শেষ দিকে কুষ্টিয়া সীমান্ত পেরিয়ে আজাদ আলীরা পৌঁছান ভারতের জলঙ্গিতে। সেখান থেকে পাঠানো হয় বিহারের চাকুলিয়া ক্যান্টনমেন্টে। এক মাস কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তিনি হয়ে ওঠেন পুরোদস্তুর গেরিলা। মুর্শিদাবাদে ক্যাপ্টেন গিয়াসের অধীনে ৭ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর লালগোলা সাব-সেক্টরে যোগ দেন তিনি। পরে ক্যাপ্টেন রশিদের নির্দেশে ১১ জনের একটি দল নিয়ে অবস্থান নেন খাজুরার ‘থাক’ নামক একটি পরিত্যক্ত বিওপিতে।

বর্ষার থইথই পানিতে নৌকাযোগে পাকিস্তানি ক্যাম্পে আক্রমণ চালিয়ে আবার ফিরে আসতেন নিরাপদ আশ্রয়ে। বাউসার হাট, বাঘা মসজিদ, ডাকরার হাট আর আড়ানি রেলওয়ে ব্রিজে একের পর এক দুঃসাহসিক অপারেশন চালান তারা।

কিন্তু ২১ নভেম্বরের সেই রাতটি ছিল অন্যরকম। বিঘা থেকে তারা তখন নাবিরপাড়ায়। লক্ষ্য- রাজশাহী থেকে আব্দুলপুরগামী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি রসদবাহী ট্রেন উড়িয়ে দেওয়া। সঙ্গে রয়েছে ৬টি অ্যান্টি-ট্যাংক মাইন। ট্রেনের ইঞ্জিনের সামনের ও পেছনের বালির বগিগুলো এড়িয়ে ঠিক ইঞ্জিনের নিচেই যেন বিস্ফোরণ ঘটে, সেই গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী মাইন সেট করা হলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেদিন ট্রেনটি আর আসেনি।

পরদিন ২২ নভেম্বর, সন্ধ্যাবেলা। পুনরায় পরিকল্পনা সাজানো হলো। নাবিরপাড়ার আখখেতের পাশে রেললাইনের স্লিপারের নিচে মাটি খুঁড়ে মাইন বসালেন তারা। ডেটোনেটর সেট করা, ৩০০ গজ তারের লেআউট- সবই নিখুঁত। কিন্তু হঠাৎ নজরে এল হলুদ রঙের কর্ডেক্সগুলো ঢাকা হয়নি। ট্রেনের সার্চলাইটে এগুলো জ্বলজ্বল করলেই ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়।

রাত তখন সাড়ে দশটা। নাটোর থেকে একটি ট্রেন চলে আসায় তারা দ্রুত আত্মগোপন করেন। সেই ট্রেনের সার্চলাইটের আলোয় নিজেদের আড়াল করে যখন পুনরায় সংযোগ দিতে গেলেন, তখনই এল দুঃসংবাদ- কাঙ্ক্ষিত ট্রেনটি আসতে দেরি হবে। এই সুযোগে তারগুলো ক্যামোফ্লেজ বা আড়াল করার কাজ শুরু করেন আজাদ আলী। সঙ্গে ছিলেন সহযোদ্ধা মাহবুবুল গনি বাবলু।

কানেকশন দেওয়ার সেই চরম মুহূর্তে বাবলু বলে উঠলেন, “ভাই, রিলিজ সুইচের ওয়েট থেকে একটা ইট কমিয়ে দিই।” কিন্তু আজাদ আলী কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাবলু একটি ইট সরিয়ে নিলেন। আর মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে গেল সেই প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণ। ছয়টি মাইন একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো।

প্রচণ্ড শব্দে পৃথিবী যেন ওলটপালট হয়ে গেল। বিস্ফোরণের তীব্রতায় রেললাইন যেন গভীর পুকুরে পরিণত হলো। মাথার ওপর দিয়ে রেললাইনের পাত আর স্লিপারগুলো শো শো শব্দে উড়ে যাচ্ছে। সুইচটি রেললাইন থেকে ৪ ফুট নিচে ছিল বলে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান আজাদ আলী। কিন্তু খেসারত দিতে হয় নিজের শরীরের অংশ দিয়ে।

বিস্ফোরণের শব্দে নাবিরপাড়া স্কুল থেকে সহযোদ্ধারা ছুটে এলেন। প্রথম কয়েক মুহূর্ত আজাদ আলী বুঝতেই পারেননি কী ঘটেছে। নিজের নির্দেশ দেওয়ার কাঠিটি খুঁজতে গিয়ে তিনি খেয়াল করলেন, তার বাঁ হাতের কবজির নিচ থেকে আর কিছুই নেই! বিস্ফোরণে কবজি উড়ে গেছে অনেক দূরে। সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল তার।

প্রাথমিক অবস্থায় রক্তক্ষরণ না হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটতে শুরু করল। সহযোদ্ধারা শক্ত করে হাত বেঁধে দিলেন। কাঠের তক্তায় শুইয়ে বাঁশে বেঁধে তাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া হলো বাঘাতে। সেখানে চিকিৎসক লাল মোহাম্মদের প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে পাঠানো হয় ভারতের বহরমপুর হাসপাতালে। সেখানেই চিকিৎসক ডা. বোসের হাতে অপারেশন সম্পন্ন হয়।

অনেকে প্রশ্ন করেন, সেই অপারেশন কি তবে বিফলে গিয়েছিল? আজাদ আলীর উত্তর স্পষ্ট, “না।” ট্রেনটি সম্পূর্ণ উড়াতে না পারলেও রেললাইন উড়ে যাওয়ায় দ্রুতগতির ট্রেনটি সেই বিশাল গর্তে পড়ে বিধ্বস্ত হয়েছিল। প্রাণ হারিয়েছিল ১৬ জন পাকিস্তানি সেনা, আহত হয়েছিল আরও ১১ জন।

আজাদ আলী আজ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব। জীবনসায়াহ্নে এসে পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস। তার স্পষ্ট বার্তা, “তোমরা কখনও দেশটাকে খাটো করে দেখো না। মায়ের পরেই ভালোবাসবে মাতৃভূমিকে। দেখবে এই দেশপ্রেমই তোমার জীবন পূর্ণ করে দেবে।”

কবজিহীন সেই হাতটি আজ কেবল একটি অঙ্গহানি নয়, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রের জন্য এক চরম আত্মত্যাগের জীবন্ত স্মারক।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ০৫ মার্চ ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button