মুক্তিযুদ্ধ

এক চোখের বিনিময়ে কেনা স্বাধীনতা: মুক্তিযোদ্ধা নাজির

ক্ষতচিহ্নের গদ্য, পর্ব ৩

নাজির বলেন, মুখ তুলতেই খেয়াল করলাম ডান চোখ দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত পড়ছে।

 ভারতের সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে চলে কুশিয়ারা। নদীটি সিলেট জেলার বিয়ানীবাজারকে দুই ভাগে ভাগ করে রেখেছে। ১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে এই নদীর তীরেই জন্ম নিয়েছিল এক কিশোরের দেশ স্বাধীনের স্বপ্ন। তখন তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী। নাম নাজির আহমদ চৌধুরী।

যুদ্ধের উন্মাদনা তখন বিয়ানীবাজারের চারাবই গ্রামের প্রতিটি ধূলিকণায়। কিন্তু সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ওপারে গিয়ে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য যে ন্যূনতম কিছু টাকার প্রয়োজন, তা কিশোর নাজিরের কাছে ছিল না। অগত্যা চাচাতো ভাই আতাউর রহমান পঙ্খির সঙ্গে বুদ্ধি আঁটেন এক দুঃসাহসিক চুরির।

অভাবের সংসার নয়, বরং যুদ্ধের পাথেয় জোগাতে নিজেদের ঘর থেকেই কয়েক মণ ধান চুরি করে হাটে বিক্রি করেন তারা। সেই টাকা সম্বল করেই ৯ মে ১৯৭১ সালে ঘর ছাড়েন নাজির, গন্তব্য ভারত।

সুতারকান্দি সীমান্ত পার হয়ে নাজির ও তার সঙ্গীরা পৌঁছান ভারতের করিমগঞ্জ ট্রানজিট ক্যাম্পে। সেখান থেকে কলকলি ইয়ুথ ক্যাম্প। ক্যাম্পটির ইনচার্জ ছিলেন আব্দুল মুনিম চৌধুরী আর সামরিক ইনচার্জ মেজর ফাত্তা চৌধুরী।

একদিন ক্যাম্পে এলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্নেল বাকসি, উদ্দেশ্য প্রশিক্ষণের জন্য সামর্থ্যবান তরুণদের বাছাই করা। কিন্তু নাজিরের ছিপছিপে গড়ন দেখে কর্নেল বাকসি তাকে প্রথম ব্যাচে নিলেন না। বললেন, “তুমি যুদ্ধ করতে পারবে না। খেয়ে স্বাস্থ্য বানাও, পরের ব্যাচে তোমাকে নেবো।”

দ্বিতীয় ব্যাচেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে ক্ষেপে যান এই তরুণ। ফিল্ড ইনচার্জ হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে সরাসরি কর্নেলকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে নাজির বললেন, “এখানে বসে বসে খেতে আসিনি, গুলি ফোটাতে এসেছি। না হলে দেশে ফিরে যাই। মরতে হয় দেশে গিয়ে পাকিস্তানিদের হাতেই মরব।”

শেষ পর্যন্ত তৎকালীন এমপিএ দেওয়ান ফরিদ গাজীর সুপারিশে তার সুযোগ হয়। বুকে ওঠে এফএফ নম্বর: ই-৬৯৬৩। এরপর ভারতের লোহারবনে শুরু হয় ২৮ দিনের কঠোর প্রশিক্ষণ। নাজির ছিলেন বি কোম্পানির কোয়ার্টার মাস্টার (সিএইচএম)।

ওস্তাদ মহাদেবের সেই প্রশিক্ষণের স্মৃতি আজও তাকে নাড়া দেয়। প্রশিক্ষণ শেষে ৪ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর জালালপুর থেকে অস্ত্র দেওয়া হয় তাদের। যেখানে অধিনায়ক ছিলেন মাহবুবুর রব সাদী এবং কোম্পানি কমান্ডার আশরাফ আলী।

৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। লক্ষ্য ছিল জকিগঞ্জের আটগ্রাম ডাকবাংলোর পাকিস্তানি ডিফেন্স দখল করা। পরিকল্পনা ছিল ডাকবাংলো কবজায় নিয়েই তারা হানা দেবেন সড়কের বাজারে পাকিস্তানি ক্যাম্পে। সুরমা নদীর ওপারেই ভারত। কমান্ডার আশরাফ আলীর নেতৃত্বে ৭৬ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল তিনটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে অভিযানে নামে।

ভোর তিনটার দিকে তারা ডাকবাংলোর কাছাকাছি পৌঁছান। ২৫ জন যোদ্ধা সুরমা নদীর ওপারে কাভারিং ফায়ারের জন্য প্রস্তুত, বাকি ২৫ জন ঘিরে রেখেছে বাংলোটি। অবশিষ্ট ২৬ জনকে নিয়ে অ্যাডভান্স করেন নাজিররা। কথা ছিল ৩টা থেকে ৩টা ৫ মিনিটের মধ্যে ভারত থেকে ডাকবাংলো লক্ষ্য করে আর্টিলারি ছোড়া হবে। কিন্তু গোলার লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়ে মাঝপথে পড়ায় পাকিস্তানি সেনারা সতর্ক হয়ে যায়।

মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে এসএলআর হাতে হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এগোতে থাকেন নাজিররা। শত্রুর ব্যূহ থেকে তখন বৃষ্টির মতো গুলি আসছিল। ৫০ গজ ভেতরে ঢুকে পড়ার পর নাজির দেখতে পান ভয়াবহ দৃশ্য। নাজিরের ডান পাশে থাকা হায়দারের পেটে গুলি লেগেছে, রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে ধানখেতের আইল। বাম পাশে থাকা আরেক সহযোদ্ধার মাথায় গুলি লেগে নিথর দেহ লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে।

রক্তাক্ত হায়দারকে বাঁচাতে নিজের এসএলআর হাতে নিয়ে তাঁকে পেছন দিকে টানতে শুরু করেন নাজির। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি বুলেট শো করে এসে বিঁধে যায় নাজিরের ডান চোখে। চোখের পাতা ভেদ করে বুলেটটি নাকের হাড় ভেঙে বাঁ পাশের গাল দিয়ে বেরিয়ে যায়। যন্ত্রণায় মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যান তিনি। অবশ শরীরে শেষ বারের মতো উচ্চারণ করেন- “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”।

নাজির বলেন, “মুখ তুলতেই খেয়াল করলাম ডান চোখ দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত পড়ছে।” সেই সংকটাপন্ন অবস্থায় কমান্ডার আশরাফ আলী নিজেও পায়ে গুলিবিদ্ধ ছিলেন, তবুও তিনি নাজিরকে কাঁধে তুলে নিয়ে আসেন নিরাপদ স্থানে। পরে নৌকা করে তাকে ক্যাম্পে নিয়ে ইনজেকশন দেওয়া হলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।

যখন জ্ঞান ফিরল, তখন তিনি ভারতের গৌহাটি সামরিক হাসপাতালে। সেখান থেকে লখনৌ বেইস হাসপাতাল হয়ে কম্বাইন্ড হাসপাতালে তার চোখের অস্ত্রোপচার করা হয়। চিরতরে হারিয়ে যায় তার ডান চোখের দৃষ্টি। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই তিনি শুনতে পান দেশ স্বাধীনের সংবাদ। সেই খুশিতে যন্ত্রণাকাতর শরীর নিয়েও ডুকরে কেঁদেছিলেন এই বীর।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. নাজির আহমদ চৌধুরীর মনে আজ আর কোনো আক্ষেপ নেই। স্বাধীনতার সার্থকতা খুঁজতে গিয়ে তিনি বলেন, “যখন দেখি কিছু না হলেও পাকিস্তানিদের মতো কেউ আমাকে অকথ্য গালি দিচ্ছে না, স্বাধীনভাবে আমি আমার মায়ের ভাষায় কথা বলছি- তখন মনে শান্তি পাই। খুব ভালো লাগে। আমার এক চোখের বিনিময়ে কেনা এই স্বাধীনতা।”

নতুন প্রজন্মের জন্য তার বার্তা স্পষ্ট ও গভীর। তিনি স্বপ্ন দেখেন এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “তোমরা ভালো চিন্তা করো। বড়দের সম্মান করো। খারাপটাকে বর্জন করো। তোমরা এ দেশটাকে ভালোবেসো। দেশের জন্য যারা আত্মাহুতি দিয়েছেন তাদের তোমরা মনে রেখো।”

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ০৩ মার্চ ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button