মুক্তিযুদ্ধ

আশা নিয়ে তাকিয়ে আছি প্রজন্মের দিকে: মুক্তিযোদ্ধা আতিউর

ক্ষতচিহ্নের গদ্য: পর্ব ৭

নতুন প্রজন্মের উন্নতি দেখলে পাহাড়সম আশা জাগে এই যুদ্ধাহতের মনে।

 

রাজধানীর ১২৮ নম্বর উত্তর যাত্রাবাড়ির একটি বাড়ি। ছায়াঘেরা এই শান্ত নিভৃত কোণেই কাটে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এস এম আতিউর রহমানের প্রাত্যহিক সময়। বয়সের ভার আর শরীরের ক্ষত নিয়ে তিনি আজ চলেন ধীর লয়ে, কিন্তু তার স্মৃতিগুলো এখনো সজাগ, ঠিক একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোর মতো।

আতিউরের শৈশবকৈশোর কেটেছে এই যাত্রাবাড়িতেই, যদিও নাড়ির টান মিশে আছে শরীয়তপুরের (তৎকালীন ফরিদপুর) জাজিরা উপজেলায়। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন কায়েদী আজম কলেজের (বর্তমান শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ) উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের যুবক। সেই যুবকের চোখেই একদিন ধরা দিয়েছিল দেশমাতৃকার পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার স্বপ্ন।

২৫ মার্চ কালরাত্রির পর চারদিকে কেবল লাশের স্তূপ আর স্বজন হারানোর হাহাকার। প্রতিদিন মানুষের মৃত্যুর খবর আতিউরকে অস্থির করে তোলে। গোপনে খোঁজ নিতে থাকেন প্রশিক্ষণে যাওয়ার। পাড়ার এক হৃদয়বান দোকানদার তার এই প্রবল আগ্রহ দেখে সাহায্যে এগিয়ে আসেন। একদিন খুব ভোরে পরিবারের মায়া ত্যাগ করে বন্ধু সাদেক আর সেই দোকানদারের সঙ্গে অজানার উদ্দেশে ঘর ছাড়েন আতিউর। পরনে ছিল শ্রমজীবীদের মতো ছিঁড়ে যাওয়া পুরোনো কাপড়, যাতে পাকিস্তানি মিলিটারিদের চোখে ধুলো দেওয়া যায়।

কমলাপুর রেলস্টেশনে তখন মিলিটারিদের সতর্ক পাহারা। সন্দেহ হলেই টেনে নামানো হচ্ছিল যুবকদের। অজানার পথে পা বাড়িয়ে কেবল আল্লাহর নাম জপছিলেন তারা। দীর্ঘ সাত ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর ট্রেন যাত্রা শেষে তারা পৌঁছান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ওই রাতে দোকানদারের বাড়িতে থেকে পরদিনই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রথমে আগরতলা শহর এবং পরে কলেজ টিলায় চলে যান।

কলেজ টিলায় তখন রিক্রুটমেন্টের দায়িত্বে ছিলেন আবদুর রব আবদুল কুদ্দুস মাখন। সেখানে নাম লেখাতেই ১১৩ জনের একটি ব্যাচ তৈরি হয়। তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় নাইটি ওয়ান বিএসএফএ। সেখান থেকে ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট হয়ে তারা পৌঁছান বিহারের চাকুলিয়া ক্যাম্পে। সেখানে আট সপ্তাহের এক বিশেষ সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন আতিউর। এটি ছিল এফএফদের সিএনসি স্পেশাল ব্যাচ

ভারতীয় ক্যাপ্টেন ইন্দ্র সিং কর্নেল দাসগুপ্তের তত্ত্বাবধানে শেখেন ফায়ারিং, এক্সপ্লোসিভ, আন্ডারগ্রাউন্ড যুদ্ধকৌশল আর আনআর্মড কমব্যাট (অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধ) ছাড়াও টাইম পেন্সিল ডেটোনেটর, টুইঞ্চ মর্টার, গ্রেনেড, লাইট মেশিন গান (এলএমজি) প্রভৃতি অস্ত্র চালনায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন তিনি। আতিউর বিশেষভাবে দক্ষ ছিলেন এলএমজি পরিচালনায়। প্রশিক্ষণ শেষে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় মেলাঘরে, সেখান থেকেই তিনি পান যুদ্ধের প্রয়োজনীয় অস্ত্র।

অস্ত্র হাতে নিয়ে গোপনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর, নরসিংদীর শিবপুর আর বেলাব হয়ে তারা চলে আসেন বেড়াইদ ইছাপুরার দিকে। নম্বর সেক্টরের অধীনে রমনা তেজগাঁও এলাকার ৪৮ জন গেরিলার সেই দলটির কমান্ডে ছিলেন আব্দুল্লাহ হিল বাকী। আরবান গেরিলা হিসেবে তাদের কাজ ছিল হিট অ্যান্ড রান, আঘাত করো এবং সটকে পড়ো। আতিউর সফলভাবে অপারেশন চালান ঢাকার গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন, সায়েদাবাদ ব্রিজ, গুলবাগ পাওয়ার স্টেশন এবং ওলোন পাওয়ার স্টেশনে।

গেরিলা অপারেশন ছাড়াও তারা সম্মুখ সমরে (ফ্রন্ট ফাইট) অংশ নিতেন। বালু নদীর ওপারে উত্তরপাড়া ক্যাম্পে ছিল তাদের অবস্থান। পাকিস্তানি সেনারা ডেমরা গোড়ানের দিক থেকে বোট নিয়ে এসে কায়েতপাড়া হাট ত্রিমোহনী গ্রামগুলোতে হানা দিত। একদিন আতিউররা যখন পাঁচজন ক্যাম্পে ছিলেন, তখনই খবর আসে কায়েতপাড়া হাটে মিলিটারি আসার। আতিউর তখন দলের টুআইসি (সেকেন্ডইনকমান্ড)

খবর পাওয়ামাত্র এলএমজি, রাইফেল গ্রেনেড নিয়ে রওনা হন তারা। ক্যানেলের কিনারা দিয়ে আধমাইল এগিয়ে সুবিধাজনক পজিশন নিতে গিয়ে দেখেন জায়গাটা ঢালু। তাৎক্ষণিক বুদ্ধিতে বেয়নেট দিয়ে কলাগাছ কেটে তার ওপর এলএমজি সেট করেন আতিউর।

পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে আতিউর রহমানের বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচের হাড় গুঁড়ো হয়ে যাওয়া সেই ক্ষতচিহ্ন, ছবি: সালেক খোকন

পাকিস্তানিরা দুটি বড় নৌকায় করে আসছিল। প্রথম নৌকাটিতে সাধারণ মানুষ থাকায় ফায়ার করতে পারেননি তিনি। কিন্তু দ্বিতীয় নৌকাটি রেঞ্জের ভেতর আসতেই এলএমজি থেকে গর্জন শুরু করেন। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় নয়জন পাকিস্তানি সেনা। বাকিদের খতম করে হাটের বিক্ষুব্ধ জনতা। আতিউরের ভাষায়, একাত্তরে ভয় ছিল না, শত্রুর কথা শুনলেই মাথা ঠিক থাকত না। সাধারণ মানুষ না খেয়েও তাদের খাইয়েছেন, সেই সমর্থনই ছিল তাদের বড় শক্তি।

ডিসেম্বরের বিজয় যখন হাতছানি দিচ্ছে, ঠিক তখনই আতিউর রহমানের জীবনে নেমে আসে সেই ভয়াবহ দিন২৮ নভেম্বর, ১৯৭১। দুপুরবেলা উত্তরপাড়া ক্যাম্পে থাকাকালীন খবর আসে ত্রিমোহনী গ্রামে পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থানের। মাত্র ১০১৩ জন যোদ্ধা নিয়ে সেখানে ঢুকতেই শুরু হয় মুখোমুখি লড়াই। পাকিস্তানিরা ছিল সুবিধাজনক উঁচুতে, আর মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ছিল ঢালু জমিতে। পজিশন বদলানোর জন্য দৌড় দিতেই হঠাৎ বাঁ পায়ে এক প্রচণ্ড ধাক্কা অনুভব করেন আতিউর। ছিটকে পড়ে যান মাটিতে।

প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে দেখেন হাঁটুর নিচ দিয়ে পিনপিন করে রক্ত ঝরছে। সেই অবস্থায় সহযোদ্ধারা তাকে নৌকায় করে উদ্ধার করেন।

একটি গ্রামে আতিউরের প্রাথমিক চিকিৎসা চলে। পাকিস্তানি বুলেটে হাড় একদম গুঁড়ো হয়ে গিয়েছিল তার। ড্রেসিং চললেও উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে ক্ষতস্থানে ইনফেকশন হয়ে পচন ধরে। স্বাধীনতার পর ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা শুরু হলেও স্বস্তি মেলেনি, পচনের কারণে মাংস কেটে ফেলে দিতে হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারিভাবে তাকে পাঠানো হয় তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ার সামরিক হাসপাতালে। সেখানে কর্নেল ক্লাগ উইলিয়াস দীর্ঘ প্রচেষ্টায় তার পায়ের ক্ষতস্থানে প্রথমে বোন গ্রাফটিং পরে স্কিন গ্রাফটিং করেন। ওই উন্নত চিকিৎসা না হলে পাটি কেটে ফেলতে হতো।

আজ একাত্তরের যুদ্ধ শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আতিউর রহমানের শরীরের ভেতর সেই যুদ্ধ আজও চলমান। পায়ের তীব্র ব্যথা আর স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে না পারার কষ্ট তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে। তবুও এই বীরের কণ্ঠে আক্ষেপ নেই, আছে তৃপ্তি। তিনি গর্বিত যে, এই স্বাধীন দেশের জন্য তিনি নিজের রক্ত দিতে পেরেছেন।

নতুন প্রজন্মের উন্নতি দেখলে পাহাড়সম আশা জাগে এই যুদ্ধাহতের মনে। তাদের উদ্দেশে এস এম আতিউর রহমান বলেন, তোমাদের প্রকৃত ইতিহাস জানতে হবে। কাদের রক্ত ত্যাগের বিনিময়ে এলো এই দেশ, সেটি জেনে নিও। সত্য ন্যায়ের পথে তোমরা দেশটাকে এগিয়ে নিও। মনে রেখো দেশ ভালো থাকলেই তোমরাও ভালো থাকবে।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ০৭ মার্চ ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button