মুক্তিযুদ্ধ

সততার সঙ্গে কাজ করার নামই দেশপ্রেম: মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল

ক্ষতচিহ্নের গদ্য: পর্ব ১৫

সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার ছিল ক্ষোভ।

একাত্তর সালের উত্তাল অক্টোবর। সিরাজগঞ্জের আকাশ-বাতাস তখন বারুদের গন্ধে ভারী। মুক্তিপাগল একদল তরুণের চোখে তখন কেবল স্বাধীনতার স্বপ্ন।

সেই স্বপ্ন আর অসীম সাহস বুকে নিয়ে যমে-মানুষে লড়াইয়ে নেমেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা এ জেড এম আমিনুল ইসলাম চৌধুরী। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাহুকা গ্রামের এই সূর্যসন্তান আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া যুদ্ধের স্মৃতি আজও অমলিন। তার শরীরের একটি গভীর ক্ষতচিহ্ন আমৃত্যু তাকে মনে করিয়ে দিত সেই রক্তাক্ত দিনগুলোর কথা।

আমিনুল ইসলামের যুদ্ধের হাতেখড়ি হয়েছিল ভারতের দেহরাদুন ট্রেনিং অ্যাকাডেমিতে, যা ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান কার্যালয়। রণকৌশলে পারদর্শী করে তুলতে সেখানে তাকে দেওয়া হয় নিবিড় প্রশিক্ষণ। তবে যুদ্ধের ভয়াবহতা তখন তুঙ্গে, তাই নেতারা চাইলেন সংক্ষিপ্ত কিন্তু কার্যকর প্রশিক্ষণ। মাত্র ১৫ দিনেই তিনি আয়ত্ত করলেন এলএমজি, এসএলআর, গ্রেনেড, মর্টার শেল ও আরসিএল গান চালানোর কৌশল। এমনকি ডিনামাইট দিয়ে ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়ার বিদ্যায়ও তিনি দক্ষ হয়ে ওঠেন।

প্রশিক্ষণ শেষে হিলি সীমান্ত দিয়ে গোপনে পা রাখলেন নিজ জনপদ সিরাজগঞ্জের রতনকান্দি ইউনিয়নে। সঙ্গে ছিল কেবল একটি রিভলভার ও ২৫টি গুলি। লক্ষ্য ছিল মূল বাহিনী আসার আগেই এলাকায় শেল্টার তৈরি করা এবং আক্রমণের ক্ষেত্র প্রস্তুত রাখা। সেখানে তিনি স্থানীয় একটি বিচ্ছিন্ন মুক্তিযোদ্ধা দলের দেখা পান। তাদের সুসংগঠিত করে নিজের দলের সঙ্গে যুক্ত করেন। ২০ দিন পর ভারত থেকে মোজাফফরের নেতৃত্বে ৮ জনের একটি প্রশিক্ষিত দল এলে গড়ে ওঠে ১৫ জনের এক শক্তিশালী গেরিলা দল।

গেরিলা যুদ্ধের মূলমন্ত্র ছিল ‘গোপনীয়তা’। নির্দেশ ছিল- পরিচয় দেওয়া যাবে না, জয়ী হলেও প্রকাশ্য উল্লাস করা চলবে না। আমিনুলরা প্রথমে বগুড়ার ধুনট থানায় অপারেশন চালালেও সেখানে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। তবে দমে যাননি তারা।

তারপর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন সিরাজগঞ্জের তাড়াশ থানায়। সেখানে পাকিস্তানি পুলিশ বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করাতে সক্ষম হন এবং উদ্ধার করেন বিপুল পরিমাণ থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল ও গুলি, যা পরবর্তী যুদ্ধের রসদ জোগায়। বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের (বিএলএফ) অধীনে তারা যখন বিভিন্ন গেরিলা আক্রমণ চালাতেন, তখন তাদের কাছে বিএলএফ বা ফ্রিডম ফাইটার (এফএফ) বড় ছিল না; ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয়টুকুই ছিল একমাত্র ধ্রুব সত্য।

আমিনুল ইসলামের জীবনের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও স্মরণীয় অপারেশনটি ছিল ভাটপিয়ারীর একটি স্কুলে স্থাপিত পাকিস্তানি ক্যাম্প আক্রমণ। ক্যাম্পটি ছিল বেশ শক্তিশালী। সেখানে প্রায় ৯০ জন পাকিস্তানি সেনা, রাজাকার ও মিলিশিয়া অবস্থান করছিল। বিপরীতে আমিনুলদের বাহিনীতে ছিল মাত্র ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা। সম্বল ছিল দুটি এলএমজি, পাঁচটি এসএলআর আর প্রচুর গ্রেনেড। কিন্তু তাদের বুকের পাটা ছিল পাহাড়সম। আক্রমণের আগে তারা শপথ করেছিলেন- “লাশ হয়ে ফিরব, তবু জয় না নিয়ে নয়।”

দিনটি ছিল ১৬ অক্টোবর। রাত তখন আনুমানিক ১১টা। আচমকা আক্রমণে কেঁপে ওঠে ভাটপিয়ারী। আক্রমণের প্রচণ্ডতায় পাকিস্তানি সেনারা হকচকিয়ে যায়। তারা ভেবেছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী আক্রমণ করেছে, তাই ভেতর থেকে চিৎকার করে বলতে থাকে ‘জয় হিন্দ’। পাল্টা জবাবে মুক্তিযোদ্ধারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে আকাশ কাঁপিয়ে সামনে বাড়তে থাকেন।

স্কুলের ছাদে দুটি বাংকারে পজিশন নিয়ে পাকিস্তানিরা বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ছিল। সামনে এগোনো অসম্ভব হয়ে পড়লে আমিনুল এক দুর্ধর্ষ পরিকল্পনা করেন। দলের চার তুখোড় গেরিলা- তোতা, ফরিদ, মমিন ও হালিমকে দায়িত্ব দেন বাংকার ধ্বংসের। তারা অস্ত্র ফেলে কোমরে লুঙ্গির ভাঁজে চারটা করে গ্রেনেড গুঁজে নিলেন। স্কুলের পাশেই ছিল একটি বিশাল বটগাছ, যার ডালপালা ছড়িয়ে ছিল ছাদের ওপর। ডাল বেয়ে উঠে তারা বাংকারে

অনবরত গ্রেনেড ছুড়তে থাকেন। মুহূর্তের মধ্যে বাংকারে থাকা চার পাকিস্তানি সেনা খতম হয়।

রাত তখন ২টা। চারদিকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আর সাধারণ মানুষের লাঠিসোটা নিয়ে এগিয়ে আসার গর্জন। আমিনুল ও মোতালেব দালানের ভেতরে ঢুকে পড়েন। বারান্দায় পা রাখতেই পেছনের একটি রুম থেকে পাকিস্তানি সেনারা গুলি ছোড়ে। একটি বুলেট সরাসরি বিদ্ধ হয় আমিনুলের নিতম্বের ডান পাশে। গুলির তীব্রতায় তিনি ছিটকে পড়েন।

রক্তে ভিজে যায় মাটি। আমিনুল বলছিলেন, “প্রথমে কিছু বুঝতে পারিনি। পরে পেছনে হাত দিতেই অনুভব করি বড় এক খণ্ড মাংস ঝুলছে। পিনপিন করে রক্ত বেরোচ্ছিল। ব্যথায় উপুড় হয়ে পড়ে চিৎকার করতে থাকি।” নেতার রক্তাক্ত দেহ দেখে সহযোদ্ধারা উন্মত্ত হয়ে ওঠেন। তাদের আক্রমণের মুখে প্রাণ বাঁচাতে আখের ক্ষেত দিয়ে পালিয়ে যায় কিছু পাকিস্তানি সেনা, কিন্তু ততক্ষণে অন্তত ৬০ জন শত্রু খতম হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে।

আহত আমিনুলকে কাঁধে করে নিয়ে যাওয়া হয় ইটালি গ্রামে। এক মাস তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। নামকরা কম্পাউন্ডার নুরুল ইসলাম মেছরা গ্রাম থেকে এসে তার ঝুলে থাকা মাংস সেলাই করে দেন। কিন্তু কয়েক দিন পর সেই ক্ষতে পচন ধরে। অসহ্য যন্ত্রণার এক পর্যায়ে সেই মাংসখণ্ড কেটে ফেলে দিতে হয়।

সেই এক মাস ছিল তার অস্তিত্বের লড়াই। প্রতিটি রাত কাটত আলাদা আলাদা বাড়িতে। সহযোদ্ধারা তাকে কাঁধে করে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে নিয়ে যেতেন শত্রু থেকে বাঁচাতে। সেই দুঃসময়ের কথা স্মরণ করে তিনি কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হতেন। তার সৌভাগ্য ছিল যে বুলেটটি হাড় স্পর্শ করেনি, নতুবা পা হারাতে হতো তার।

বীর মুক্তিযোদ্ধা এ জেড এম আমিনুল ইসলাম চৌধুরী পরবর্তী জীবনে স্বাধীন দেশকে অনেক দূর এগিয়ে যেতে দেখেছেন। তবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার ছিল ক্ষোভ। নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তার চিরন্তন বার্তা ছিল স্পষ্ট- “স্বাধীনতা অনেক ত্যাগের ফসল। সেই ত্যাগের মূল্য দিতে হলে দেশটাকে ভালোবাসতে হবে। নিজের কাজটা সততার সঙ্গে পালন করাই হলো প্রকৃত দেশপ্রেম।”

২০২১ সালের পর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও তার শরীরের সেই ক্ষতচিহ্ন আর ত্যাগের গল্প বাংলার ইতিহাসের পাতায় অক্ষয় হয়ে থাকবে।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১৫ মার্চ ২০২৬

© 2026, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button