শহীদ সুফিয়া: কোরআনের পাতায় রেখে যাওয়া অম্লান রক্ত

“দরজা ভেঙে পিশাচেরা যখন ঘরে ঢোকে, মা তখন পবিত্র কোরআন শরীফ বুকে জড়িয়ে ধরে বসে ছিলেন।”
এক সাগর রক্ত, অগণিত আত্মত্যাগ আর দীর্ঘ সংগ্রামের কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে আমরা অর্জন করেছি আজকের এই স্বাধীন মানচিত্র। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার সেই মহাকাব্যিক লড়াইয়ে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন ত্রিশ লাখ শহীদ। অথচ সেইসব বীর সন্তানদের অনেক আত্মত্যাগের ইতিহাস আজও লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শহীদ পরিবারগুলোর বেঁচে থাকার যে নিরন্তর লড়াই, সেটিও ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
একাত্তরের সেই অবিনাশী ইতিহাসের সন্ধানে এক বিকেলে আমি মুখোমুখি হয়েছিলাম শহীদ সুফিয়া খাতুনের সন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মুরাদ হোসেনের। বর্তমানে তিনি প্রয়াত। দুই ভাই-বোনের সংসারে মুরাদ ছিলেন বড়। তাদের শৈশব-কৈশোর কেটেছে সৈয়দপুরের বিহারি সমাজের পরিমণ্ডলে। বাবা আমজাদ হোসেন সিকদার ছিলেন রেলওয়ের অ্যাকাউন্টস অফিসার। সেই সুবাদে একাত্তরে তারা সৈয়দপুর শহরের আতিয়ার কলোনির এল-৭৬-বি নম্বর কোয়ার্টারে বসবাস করতেন।
সেসময় সৈয়দপুরে বিহারিদের একাংশের একাধিপত্য ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের একনিষ্ঠ অনুসারীদের প্রতি তারা ছিল চরম বিদ্বেষী। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পর যখন ক্ষমতা হস্তান্তরের টালবাহানা শুরু হয়, তখন বিহারিরা বাঙালিদের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, বাঙালিরাও ভেতরে ভেতরে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিতে থাকে।
সেই উত্তাল সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে মুরাদ হোসেন বলেছিলেন, “বিহারিদের সঙ্গে আমাদের দ্বন্দ্ব ক্রমেই তীব্র হচ্ছিল। তাদের নেতা ছিলেন সৈয়দপুর কলেজের প্রিন্সিপাল মতিন হাশমি। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২৩ মার্চ চূড়ান্ত ফয়সালা হবে যে, এদেশে কারা থাকবে। কিন্তু সেই হুমকিতেও আমরা দমে যাইনি। আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, প্রয়োজনে প্রাণ দেব কিন্তু মাথা নত করব না।”
২২ মার্চ রাতেই গোলারহাটে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। বিহারিরা আক্রমণ করলে স্থানীয় বাঙালিদের সঙ্গে শুরু হয় তীব্র লড়াই। ২৪ মার্চ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সেনারা সিভিল ড্রেসে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে এবং মাথায় গামছা বেঁধে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করে। প্রাণ বাঁচাতে অনেকেই তখন গ্রামের দিকে আশ্রয় নেন।
পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে মুরাদের ছোট বোন ইভা জোহরাকে নীলফামারীর মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কলোনির কোয়ার্টারে মা সুফিয়া খাতুনের সঙ্গে তখন ছিলেন দূরসম্পর্কের বোন জোবাইদা। মুরাদ তখন কলোনিতে ফিরতে পারছিলেন না, কারণ বিহারিরা প্রকাশ্যে তার মাথার দাম ঘোষণা করেছিল। ক্ষিপ্ত ঘাতক দল বাড়িতে অতর্কিত আক্রমণ করে এবং মুরাদের মমতাময়ী মাকে পৈশাচিকভাবে দ্বিখণ্ডিত করে হত্যা করে।
সেই করুণ ইতিহাসের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন মুরাদ হোসেন। বুকচাপা কষ্টের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে আসছিল চারপাশ। অশ্রুসজল চোখে তিনি বর্ণনা করেন শহীদ মাতা সুফিয়া খাতুনের সেই শেষ মুহূর্তের কথা:
“সৈয়দপুর শহরের বাঙালিদের তখন একরকম বন্দি করে ফেলা হয়েছিল। ১৪ এপ্রিল রাতে আম্মাকে ওরা নির্মমভাবে হত্যা করে। কলোনিতে সেটাই ছিল তাদের প্রথম সশস্ত্র হামলা। আমাদের কোয়ার্টারটি ছিল মেইন রোডের পাশেই। মার্চের শুরুতেই আমি সেই একতলা বাড়ির ছাদে লম্বা বাঁশ দিয়ে একটি বিশাল বাংলাদেশের পতাকা আর একটি কালো পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলাম। অনেক দূর থেকে সেই পতাকা দেখা যেত, যা দেখে পাকিস্তানি সেনারা চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।”
কয়েকজন বিহারি প্রথমে এসে আম্মাকে হুমকি দেয়, ‘উসকো উতার দো’ (ওটা নামিয়ে ফেলো)। মা উত্তর দিয়েছিলেন, “আমার ছেলে এটা টাঙিয়েছে, আমি এটা নামাতে পারব না।” তারা পুনরায় পাকিস্তানি সেনার ভয় দেখালেও মা বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। উল্টো তিনি তাদের ছাদে উঠতে বাধা দেন। ঘাতকরা হুমকি ও গালিগালাজ করতে করতে ফিরে যায়।
এর কিছুক্ষণ পরই বিহারি ও পাকিস্তানি সেনাদের একটি সশস্ত্র দল এসে দরজায় আঘাত করতে থাকে। মা তখন শান্তচিত্তে রেহালে কোরআন শরীফ রেখে পাঠ করছিলেন। পেছনের দরজা দিয়ে বোন জোবাইদাকে পাঠান পাশের বাড়ির বাবার বন্ধুর সাহায্য চাইতে। কিন্তু পথেই ওই বিহারিরা বোনটিকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
সম্মুখের দরজা ভেঙে পিশাচেরা যখন ঘরে ঢোকে, মা তখন পবিত্র কোরআন শরীফ বুকে জড়িয়ে ধরে বসে ছিলেন। তিনি প্রাণভিক্ষাও চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই হায়েনাদের মনে বিন্দুমাত্র করুণা জাগেনি। পবিত্র কালাম বুকে ধরা অবস্থাতেই তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে মায়ের দেহ থেকে মাথা আলাদা করে দেয়। পুরো ঘর রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়, এমনকি আল্লাহর কালাম কোরআন শরীফটিও রক্তে ভিজে মাটিতে পড়ে থাকে।
মুসলমান হয়েও পাকিস্তানের দোসর বিহারিরা কী চরম বর্বরতা চালিয়েছিল, তা ভাবলে আজও গা শিউরে ওঠে। তারা মায়ের লাশটি পর্যন্ত আমাদের দেয়নি, ট্রাকে করে নিয়ে গিয়েছিল। বোন জোবাইদার লাশটি কয়েকদিন রাস্তায় পড়েছিল, পরে পচা দুর্গন্ধে স্থানীয়রা তা মাটি চাপা দেয়।
বিহারিরা চলে যাওয়ার পর পাশের বাসার একজন হৃদয়বান ব্যক্তি ঘর থেকে মায়ের সেই রক্তমাখা কোরআন শরীফটি সংগ্রহ করেন। মায়ের স্মৃতি হিসেবে আজ আমাদের কাছে কেবল সেই পবিত্র গ্রন্থটিই অবশিষ্ট আছে, যার প্রতিটি পাতায় লেগে আছে মায়ের ছোপ ছোপ রক্ত।
অশ্রুভেজা নয়নে মুরাদ আরও বলেছিলেন, “মায়ের রক্তমাখা সেই কোরআন শরীফ হাতে নিলে বুকের ভেতর হাহাকার শুরু হয়। মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমি যদি পতাকা দুটি না টাঙাতাম, তবে হয়তো আমার মাকে এভাবে মরতে হতো না। স্বপ্নে এখনো মায়ের আর্তনাদ শুনে জেগে উঠি। দেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমরা আমাদের মাকে ফিরে পাইনি, এমনকি তার কবরের চিহ্নটুকুও নেই। পুরো বাংলার মাটিতেই মিশে আছে আমার মায়ের রক্ত।”
শহীদ সুফিয়া খাতুনের মতো লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে সিক্ত হয়েছে এই উর্বর ভূমি। তাদের এই আত্মত্যাগ বাঙালির চিরকালীন আলোকবর্তিকা। জাতি এই সূর্যসন্তানদের কোনোদিন বিস্মৃত হতে দেবে না।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
© 2026, https:.




