মুক্তিযুদ্ধ

সবচেয়ে বড় কন্ট্রিবিউশন সাধারণ মানুষের, উই মাস্ট স্যালুট দেম

পাকিস্তানি সেনারাই বলত, “যেদিকে দেখি সেদিকেই শত্রু দেখি। উই ক্যান নট ট্রাস্ট অ্যা সিঙ্গেল বেঙ্গলি

মুক্তিযোদ্ধা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ইকবাল রশীদ। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর (পিএএফ) একজন পাইলট অফিসার। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি পাকিস্তান থেকে পালিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার অদম্য আকাঙ্ক্ষাই তাকে টেনে এনেছিল রণাঙ্গনে।

পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসার পর তার প্রাথমিক অভিজ্ঞতার কথা জানা যায় তারই বয়ানে। তিনি বলেন, “ফোর্ট উইলিয়াম কলকাতা ক্যান্টনমেন্টে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ইন্টারোগেইট বা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। পাকিস্তান থেকে কোনো সামরিক অফিসার ফেরত এলে ওখানে যাওয়াই ছিল নিয়ম। এরপর আমাকে দিল্লি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দিল্লি থেকে কলকাতায় গিয়ে দেখা করি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর সঙ্গে। একদিন পরই ওসমানী সাহেব আমাকে পোস্টিং দেন ছয় নম্বর সেক্টরে।”

ইকবাল রশীদ প্রথমে শিলিগুড়িতে যান। সেখান থেকে ভারতীয় ট্রাকে করে পৌঁছান স্কোয়াড্রন লিডার সদর উদ্দীন (বীর প্রতীক)-এর ভজনপুর সাব-সেক্টরে। সেখানে তার দেখা হয় ফার্স্ট ব্যাচের অফিসার লেফটেন্যান্ট মাসুদ ও লেফটেন্যান্ট মতিন চৌধুরীর সঙ্গে। পরবর্তীতে সদর উদ্দীন সাহেব তাকে একটি জিপে করে নিয়ে যান বুড়িমারীতে, যা ছিল ছয় নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার। তৎকালীন উইং কমান্ডার মোহাম্মদ খাদেমুল বাশার (বীর উত্তম) ছিলেন সেই সেক্টরের কমান্ডার। সেখানেই ইকবাল রশীদের সাক্ষাৎ হয় ক্যাপ্টেন মোশায়েদ ও ক্যাপ্টেন নজরুলসহ অন্যান্য বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে।

একজন বিমান বাহিনীর অফিসার হিসেবে আকাশপথের যুদ্ধকৌশল ইকবাল রশীদের জানা ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ তো করতে হবে সমতলে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। তাই তাকে ১৫ দিনের পদাতিক (ইনফ্যান্ট্রি) প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয় পাটগ্রাম সাব-সেক্টরে, ক্যাপ্টেন মতিউর রহমানের কাছে। সেখানে তিনি ইপিআরের এক হাবিলদার মেজরের কাছে রাইফেলসহ বিভিন্ন অস্ত্র চালনা, আক্রমণের কৌশল, পিছু হটা (রিট্রিট), অ্যাম্বুশ এবং পরিকল্পনার খুঁটিনাটি শেখেন। ডিফেন্স ব্লক করা ও ডিফেন্স অ্যাটাক করার মতো কৌশলগুলোও আয়ত্ত করেন। এছাড়া সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট ফারুক তাকে টু-ইঞ্চ মর্টার ফায়ার করার প্রশিক্ষণ দেন।

প্রশিক্ষণ শেষে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হন এবং তাদের সঙ্গে সাত দিনের মতো অবস্থান করেন। মুক্তিযোদ্ধারা কীভাবে থাকেন, কীভাবে পরিকল্পনামাফিক অপারেশন পরিচালনা করেন, সেসবের বাস্তব অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেন। তিনি বলেন, “গ্রামের ছেলেরা অল্প কয়েকদিনের ট্রেনিং নিয়েও যে সাহস আর কনফিডেন্স তাদের ভেতর দেখেছি, তা আমাকে খুব অবাক করেছে। তাদের সঙ্গেই একরাতে শঠিবাড়িতে একটি অপারেশন করে ফিরে আসি।”

এর কিছুদিন পরই সেক্টর কমান্ডার তাকে ভারত সীমান্তবর্তী দেওয়ানগঞ্জে নিয়ে যান। স্থানটি ছিল চিলাহাটির দক্ষিণে। সেখানে ভারতীয় মেজর সাতওয়ালের কাছ থেকে ইকবাল রশীদ চিলাহাটি সাব-সেক্টরের দায়িত্ব বুঝে নেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন এই সাব-সেক্টরের আওতায় ছিল ডিমলা এবং নীলফামারী অঞ্চলের সৈয়দপুর, কিশোরগঞ্জ, জলঢাকা ও ডোমার প্রভৃতি এলাকা।

রণকৌশল সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমাদের ছিল ৪টি কোম্পানি। একটি মুভ করে চিলাহাটি হতে ডোমার ও ডিমলার দিকে। আরেকটা জলঢাকা হয়ে মুভ করে। এক কোম্পানিতে কিবরিয়া ছিল। আমার সঙ্গে থাকা দুটি কোম্পানিতে ছিল সমশের ও আমিনুল। প্ল্যান ছিল পুরো এলাকায় পাকিস্তানি আর্মিদের ওপর আক্রমণ করতে করতে একটি জায়গায় নিয়ে আসা। সঙ্গে জুনিয়র লিডার আর ট্রেইনারও ছিল। স্থানীয় যুবকদের তারা ট্রেনিং দিয়ে কাজে লাগাতেন। এ দলে খুব কমই ছিল ১৮-১৯ বছরের বেশি বয়সি। কিন্তু অসীম সাহস নিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন।”

নভেম্বরের শেষের দিকে তারা দেওয়ানগঞ্জ থেকে সামনের দিকে অগ্রসর হন এবং ১৬ ডিসেম্বরে নীলফামারী শহর থেকে কিছুটা দূরে নথখানা নামক স্থানে একত্রিত হয়ে ক্যাম্প স্থাপন করেন। রণাঙ্গনের বেশ কিছু রোমহর্ষক ঘটনা আজও এই বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

কিশোরগঞ্জের একটি যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “কিশোরগঞ্জে অ্যাডভান্স হচ্ছি। টিএনও অফিসের দিকে ওরা বাংকার করেছিল। সেখান থেকে হঠাৎ ফায়ার শুরু হয়। সবাই শুয়ে পড়ে। সারাদিন ফায়ার হচ্ছে, আমরা এগোতে পারছি না। তখন তাজুল ইসলাম নামে এক ছাত্রলীগের ছেলে ও রাজ্জাক একটা ট্রাকে করে থ্রি-ইঞ্চ মর্টার নিয়ে আসে। কিন্তু সেটা পরিচালনায় অভিজ্ঞ তিন-চারজন লাগবে। কোথায় পাবো তাদের? দুইটা ছেলে এগিয়ে এসে বলে, আমরা একটা ছোট্ট কোর্স করেছি, পারব। তারা সেটাকে মাটিতে রেখে সেট করে নেয়। কিন্তু সাইড গেজ নেই, কোন দিকে মারতে হবে এটা কে ভলান্টিয়ার করবে? আরও দুজন এসে বলে, আমরা করব স্যার। খালের ওপারে পাকিস্তানিরা, এ পারে আমরা। ছেলে দুটি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লুকিয়ে এ পাড়েই খালের কিনারায় দাঁড়িয়ে ডান ও বাম হাত উঁচিয়ে সিগন্যাল দিলে আমরা থ্রি-ইঞ্চ মর্টার ছাড়ি। ১০-১২টা ফেলার পর ওইদিক থেকে ফায়ারিং পুরো বন্ধ হয়ে যায়। তখনই ক্যাম্প দখলে নিই।”

ডোমারের বোড়াগাড়ীতে সংঘটিত আরেকটি যুদ্ধের ঘটনাও তিনি তুলে ধরেন। সেখানে তুমুল যুদ্ধ হয় এবং কোম্পানি কমান্ডার সিদ্দিক আহত হন। বিকেল থেকে শুরু হওয়া অপারেশনটি চলে রাত পর্যন্ত। রাতে পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটে যাওয়ার সময় ব্রিজটি উড়িয়ে দেয়। কিন্তু এক পাকিস্তানি সেনা বাংকারে আটকা পড়ে যায়।

ঘটনাটির বর্ণনা দিয়ে ইকবাল রশীদ বলেন, “হঠাৎ মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান দৌড়ে এসে বলেন, এক পাকিস্তানি সেনা আটকা পড়েছে। গিয়ে দেখি সে বাংকারে, আর চারপাশে শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় আছে, কখন তাকে ছিঁড়ে ফেলবে। আমার কাছে অনুমতি চাইলো। তাদের বোঝাই, এই লোকটা ফিরে গেলে আমরা ৪ জন বাঙালি পাকিস্তান থেকে ফেরত আনতে পারব। মেরে ফেললে কোনো লাভ নেই। পাকিস্তানে আটক আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের ফিরিয়ে আনাটাও যুদ্ধ। ওই সেনা সদস্যের নাম ছিল বশির। ওকে তুলে ক্যাম্পে নিয়ে আসি। পরে ভারতীয় সেনাদের কাছে হ্যান্ডওভার করি। ধর্ম যদি বলেন, বলা হয়েছে- শত্রু যদি সারেন্ডার করে ডোন্ট কিল হিম। অনেকেই চেষ্টা করেছিল মুসলিম লীগার, জামায়াত ও নন-বেঙ্গলিদের ওপর আক্রমণের। আমরা সেটা করতে দেইনি। তাদের বুঝিয়েছি, এটা করতে আসিনি আমরা।”

মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের অবদানকে ইকবাল রশীদ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তার মতে, আমরা প্রায়ই তাদের অবদানের কথা ভুলে যাই। তিনি অকপটে বলেন, “এই নয় মাসে যারা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছেন, তাদের কথাই কেউ বলি না। যারা সৈনিক বা মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম, আমাদেরকে পাকিস্তানি সেনারা অ্যাটাক করলে ভারতে সরে যেতে পারতাম। কিন্তু সাধারণ মানুষ যারা গ্রাম বা শহরে ছিলেন, তারা কোথায় যাবেন? তারাই সরাসরি ওদের অত্যাচার ফেস করেছেন। গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা আসছে, এই অপরাধে গ্রামের বাড়িগুলো ওরা জ্বালিয়ে দিত। এভাবে নির্যাতিত হয়েছেন সাধারণ মানুষ।”

সাধারণ মানুষের সহযোগিতার চিত্র তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “চিলাহাটি থেকে যখন দুটো কোম্পানি নিয়ে মার্চ করি, রাস্তায় দেখি শত শত লোক মুড়ি আর গুড় হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। অনেক জায়গায় অচেনা লোকেরাই রান্না করে খাবার দিয়েছেন। এটা যে কত বড় সাপোর্ট, আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না। অ্যান্টি-ট্যাংক মাইন ও অ্যামুনেশন ক্যারি করার জন্য লোক লাগত; গ্রামের মানুষই ভলান্টিয়ার করেছে। সৈয়দপুরে ধরে ধরে বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে, রংপুরের অনেককেই মেরে ফেলা হয়েছে, বুড়িমারীতে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয় বহু নারীকে। কই তাদের কথা তো আমরা তুলে ধরিনি।”

পাকিস্তানি বাহিনী সাধারণ মানুষকে কতটা অবিশ্বাস করত, তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পাকিস্তানি আর্মিরা কোথায় লুকিয়ে আছে তা আগেই এসে আমাদের বলে যেত সাধারণ মানুষ। কারণ তারা আমাদের সাথে ছিলেন। পাকিস্তানি আর্মিই বলত, ‘যেদিকে দেখি সেদিকেই শত্রু দেখি। উই ক্যান নট ট্রাস্ট অ্যা সিঙ্গেল বেঙ্গলি।’ অস্ত্রশস্ত্রে তারা তো কোনো অংশেই কম ছিল না। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের সাথে ছিলেন না। বিজয়ের অন্যতম কারণ ছিল এটা। তাই একাত্তরে সবচেয়ে বড় কন্ট্রিবিউশন ছিল সাধারণ মানুষের। উই মাস্ট স্যালুট দেম। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর কেটে গেল; উই ডোন্ট স্যালুট দ্য পিপল।”

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫

© 2025, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button