মুক্তিযুদ্ধের অজানা ঘটনাগুলো

সুলতানা রাজিয়া
রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল ১৯৭১ সালে। সেই যুদ্ধ ছুঁয়ে গিয়েছিল দেশের প্রতিটি মানুষকে। যারা স্বাধীনতার পক্ষে ছিল তারা কোনো না কোনোভাবে অত্যাচারিত, নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যারা স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল তারা কোনো না কোনোভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে, মুক্তিকামী মানুষের ক্ষতিসাধন করেছে। তবে এই দুটি পক্ষের মাঝে ছিল না কোনো পরিষ্কার ব্যবধান রেখা। একই পরিবারের ছেলে মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা যোদ্ধা আর বাবা হয়তো শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হয়ে তথ্য দিয়ে মুক্তিকামী মানুষকে ধরিয়ে দিচ্ছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে। কোনো গৃহবধূর স্বামী হয়তো পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর কিন্তু বাবা মুক্তিযোদ্ধাদের রসদ পাঠাচ্ছেন। বাবার এই অপরাধের জন্য স্বামী তাকে পাঠিয়ে দিচ্ছে বাবার বাড়ি।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য মানুষ হয়তো যতটুকু পেরেছে তা-ই নিয়েই নেমেছে পথে। কিন্তু পথে এ দেশের কিছু মানুষের হাতে হারিয়েছে সহায় সম্বল সবকিছু। তবে এটিই শেষ নয়। সব হারানো এই মানুষগুলোকে সহযোগিতা করেছেও কিন্তু পথের মানুষই। তারা এই মানুষগুলোকে দিয়েছে চিড়া-মুড়ি-গুড়, নিজেদের সাধ্যানুযায়ী। এভাবেই সে সময়ে সজ্ঞানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের পরতে পরতে লিপিবদ্ধ রয়েছে অজানা হাজারো ঘটনা। এর কোনোটিই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বাইরে নয়। সেই বিপুল ইতিহাস থেকে কিছু ইতিহাস তুলে এনেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক-লেখক সালেক খোকন তার ‘মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী ঘটনামালা’ বইয়ে।

পঞ্চাশটি শিরোনামে তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধের ঘটনামালা। ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা তুলে ধরেছেন তাদের অভিজ্ঞতা। মুক্তিযুদ্ধের নিযুত ঘটনার মধ্যে এর পরিমাণ তৃণ সমান হলেও এই ঘটনাগুলো মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর ভয়াবহতা, অনিশ্চয়তা, আকস্মিকতা বুঝতে সাহায্য করে। মুক্তিযুদ্ধকে যেকোনো একদিক থেকে না দেখে নানা দিক থেকে বুঝতে এবং উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
মুক্তিযোদ্ধা শেখ ফাতেমা আলী তেমনি একজন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন সাধারণ গৃহবধূ। স্বামী ছিলেন পাকিস্তানপন্থি। ১৯৭১ সালে তিনি গর্ভধারণ করেন। স্বামী তখন তাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। বাবা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতেন। সেই অপরাধে গ্রামের মানুষ তাদের বাড়িঘর চিনিয়ে দেয়। পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। ফাতেমাদের ঘরসংসার শুরু হয় তখন নৌকায়। গ্রামের মানুষ সেটিও পাকিস্তানি সেনাদের চিনিয়ে দেয়। একদিন পাকিস্তানি সেনারা তাদের নৌকা ঘিরে ফেলে এবং তার বাবাকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার অপরাধে ধরে। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন তথ্য বের করার জন্য যখন পাকিস্তানি সেনারা তার বাবাকে মারছিল তখন কান্না শুনে ফাতেমা আলী ছুটে যান বাবার কাছে। পাকিস্তানি সেনারা তখন অত্যাচার করার নতুন অস্ত্র পেয়ে যায়। বেয়নেট দিয়ে আঘাত করে ফাতেমা আলীকেও। তাতেও মুখ খোলাতে না পেরে বাবার সামনেই শারীরিক নির্যাতন শুরু করে ফাতেমা আলীর ওপর। এরপর তাকে নিয়ে যায় তাদের একটি ক্যাম্পে যেখানে আগে থেকেই বন্দি ছিল আরও দেড়শ নারী। সেখানকার এক নারীর বাবা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। তিনিই এই ক্যাম্পের কথা হেমায়েত বাহিনীর প্রধান বীরবিক্রম হেমায়েতউদ্দিন ও মেজর মঞ্জুরকে। তারাই ওই ক্যাম্পে আক্রমণ করে মুক্ত করেন ওই নারীদের।
এখানেই শেষ নয়। নতুন জীবন লাভ করে ফাতেমা আলী চিন্তা করেন লড়াই করবেন। তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিলেও দেওয়া সম্ভব ছিল না হাতিয়ার বা বিস্ফোরক। কিন্তু তারা নিজেরাই একটি বিস্ফোরক তৈরি করেন তামাকের ফাঁকি, মরিচের ফাঁকি আর চুলার ছাই দিয়ে। এগুলো তারা ছুঁড়ে দিতেন পাকিস্তানি সেনা আর তাদের দেশীয় দোসরদের দিকে। তারা যখন চোখ-মুখ বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ত তখন তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতেন বন্দুক। এভাবেই রণাঙ্গনের লড়াইয়েও যুক্ত ছিলেন। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর কাক্সিক্ষত মুক্তি পাননি। পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন বলে তাকে তালাক দেয় স্বামী। বাবা আশ্রয় দিতে চাইলেও গ্রামবাসীর চাপে সেটিও ঘটেনি। দেশের জন্য সর্বস্ব ত্যাগকারী মুক্তিযোদ্ধা নিজের পরিবারেই পাননি আশ্রয়, গ্রামের মানুষের আপত্তির মুখে। যুদ্ধোত্তর দেশেও তাকে দীর্ঘদিন যুদ্ধ করতে হয়েছে।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে স্থানীয়ভাবেই অনেক জায়গায় তাদের প্রতিরোধ করা হয়েছিল। পাবনা শহর এমন একটি জায়গা। ২৬ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন পাবনা পুলিশ লাইন্সের দিকে এগিয়ে যায় তার আগেই পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন বিল্ডিংয়ের ছাদে অবস্থান নেন। তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন। পুলিশ সদস্যরা ১০ এপ্রিল পর্যন্ত নিজেদের মুক্ত রাখেন পাবনা শহরকে। পরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আরও সৈন্য ও অস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে এলে মুক্তিযোদ্ধারা আত্মগোপনে চলে যান। মুক্তিযোদ্ধা অমল কৃষ্ণ গোস্বামী এই পাবনার সন্তান। তার ডাক নাম দিলীপ। তারা বহু কষ্টে ভারতে পৌঁছান। নদীপথে প্রসাদপুরে কিছু দুর্বৃত্ত তাদের আক্রমণ করে সোনাদানা ও অর্থ কেড়ে নেয়। অসহায় তারা যখন পথ চলছিলেন তখন মানুষ তাদের খাদ্য দিয়ে সাহায্যও করেছিল পরে। সে জন্যই তারা ভারতে পৌঁছতে পারেন। যখন তারা যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন তার মা রাজি হচ্ছিলেন না। তখন তার এক দাদু তার মাকে বলেন, তোমার তো অনেক সন্তান। একটি ছেলে দেশকে দাও! তার মা তখন কান্না সংবরণ করে যুদ্ধে যেতে রাজি হন। দেশ মা অবশ্য দিলীপকে ফিরিয়ে দিয়েছিল তার মায়ের কাছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বাধীন দেশে মায়ের সেবা করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
কিন্তু তেমন ভাগ্য ছিল না নুরুজ্জামানের। মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবির বর্ণনা দিয়েছেন সে ঘটনার। একটি যুদ্ধে বাঙ্কার থেকে পাকিস্তানি সেনারা যখন পালিয়ে যায় তখন তারা দেখেন সেখানে একজন নারী বন্দি ছিলেন। তিনি জানান, পাকিস্তানি সেনারা তার দুই ছেলেকে মেরে ফেলেছে এবং তাকে শারীরিক নির্যাতন করেছে। আর তাকে ধরিয়ে দিয়েছে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। ওই চেয়ারম্যানকে ধরে আনার পর দেখা গেল সে গেরিলাযোদ্ধা নুরুজ্জামানের বাবা। সব শুনে নুরুজ্জামান তার বাবার সামনে এসে বলেন, ‘আব্বা, আপনে এই কাজ করলেন! আপনি পাকিস্তানকে ভালোবাসেন, আমগো একটা বোন ওগো হাতে তুইলা দিতেন।’ নিরুত্তর বাবাকে আর প্রশ্ন করলেন না এই মুক্তিযোদ্ধা। হাতের স্টেনগানের ট্রিগার টিপে দিয়েছিলেন। বিশ্বাসঘাতক নিজের বাবা হলেও তাকে ক্ষমা করেননি মুক্তিযোদ্ধারা।
এমন অনেক অজানা অশ্রুত ঘটনাবলিতে সমৃদ্ধ এই বইটি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে তোমাদের সাহায্য করবে।
বই-আলোচনাটি প্রকাশিত হয়েছে দেশ রূপান্তরে, প্রকাশকাল: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫
© 2025, https:.