বই-আলোচনা

সারা বাংলা যখন রণাঙ্গন

সুলতানা রাজিয়া

বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটি সৃষ্টি হয়েছে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল অপর কোনো রাষ্ট্র বা ভূখন্ডকে দখল করার জন্য নয়, বরং নিজের মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার জন্য। সে জন্যই এই যুদ্ধকে বলে মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধে দেশের আপামর জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিল।

নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়লে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পুলিশ সদস্যরা। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টও বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরোধ শুরু করে। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষিত বিপুল সংখ্যক সদস্যের বিরুদ্ধে তাদের সংখ্যা ছিল নিতান্তই অপ্রতুল। সে জন্য প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এই ভূখন্ডের আলাদা সেনাবাহিনীর বা মুক্তিফৌজের।

মুক্তিবাহিনী গড়ে ওঠে দেশের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে। বাঙালি পুলিশ ও আর্মির সদস্যরা যেমন ছিলেন তেমনি হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ মুক্তিযুদ্ধে নাম লিখিয়েছিলেন। তারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, হটিয়ে দিয়েছেন এবং অবশেষে তাদের পরাজিত করে দেশকে শত্রুমুক্ত করেছেন। এরাই আমাদের মুক্তিযোদ্ধা। এই মুক্তিযোদ্ধারা সারাদেশে যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধারা মূলত গেরিলা কৌশলে যুদ্ধ করেছেন। তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গতিপথের ওপর নজর রাখতেন, এ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতেন, এরপর অতর্কিতে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন। গেরিলা যোদ্ধারা ছিলেন এ দেশের সন্তান। মুক্তি, বিচ্ছুবাহিনী এদের আতঙ্কে বিপর্যস্ত থাকত পাকিস্তানি সেনারা। নিজ নিজ অঞ্চলের রাস্তাঘাট, অলিগলি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নখদর্পণে। তা ছাড়া তারা সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতাও পেতেন প্রচুর।

পাকিস্তানি সেনাদের ওপর অতর্কিতে আক্রমণ করে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়ে অবলীলায় মিশে যেতেন সাধারণ মানুষের ভিড়ে।এ জন্য তাদের খোঁজ পেত না সেনাবাহিনী। তারা তখন প্রতিশোধ নিতে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিত। মুক্তিযোদ্ধাদের ঠিকানা ও বিভিন্ন তথ্য দেওয়ার জন্য চাপ দিত। কিন্তু সাধারণ মানুষ মুখ বুজে সে অত্যাচার সহ্য করত কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কিত কোনো তথ্য দিত না। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এ দেশের এক শ্রেণির মানুষকে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের দলে টেনে নিয়েছিল। তারাই জনসাধারণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে তথ্য দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করত।

তাদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বহু সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাকে বন্দি করতে সক্ষম হয়। তাদের ওপর চালায় অবর্ণনীয় অত্যাচার। এই ঘটনা শুধু নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের মধ্য সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা দেশ হয়ে উঠেছিল এক রক্তাক্ত রণাঙ্গন। সেই রণাঙ্গনের সম্পূর্ণ দৃশ্যপট এত বিশাল আর এত বৈচিত্র্যময় যে, পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও আমরা সে সম্পর্কে জানতে পেরেছি খুবই কমই। সে কারণে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক বই রচিত হলেও রণাঙ্গন সম্পর্কে সার্বিক চিত্র দেয় এমন বইয়ের সংখ্যা নিতান্তই অপ্রতুল। আর সহজ সরল ভাষায় কিশোর-কিশোরীদের উপযোগী বইয়ের সংখ্যা তো আরও কম। সে ক্ষেত্রে লেখক ও গবেষক সালেক খোকন রচিত ১৯৭১ : রণাঙ্গনের লড়াই বইটি নিঃসন্দেহে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।

হাতে গোনা যে কজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এখনো জীবিত আছেন তাদের বর্ণনায় তিনি তুলে ধরেছেন, ’৭১-এর রণাঙ্গনের ঘটনা। রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ বয়ানের কারণে বইটি হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিশ্বস্ত দলিল। লেখকের তোলা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আলোকচিত্র ও মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন সংগৃহীত আলোকচিত্রগুলো বইটিকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা। ছেষট্টি শিরোনামে একশরও বেশি ঘটিত যুদ্ধের বর্ণনা আছে বইটিতে। তার যেকোনো যুদ্ধ ঘটনা কোনো বইয়ে বর্ণিত বা সিনেমার প্রদর্শিত রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের থেকেও বেশি রোমাঞ্চকর, সাহসিকতাপূর্ণ এবং ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের এই লড়াইগুলো সম্পর্কে জানলে পরিপূর্ণভাবে জানা যায়, কেন বলা হয় বাঙালি বীরের জাতি!

এমন সাহসিকতাপূর্ণ একটি ঘটনা হলো, ‘হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল’ অপারেশন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণ করত। দেশের এবং দেশের বাইরের মানুষ যেন দেশের প্রকৃত অবস্থা জানতে না পারে সে জন্য সবকিছু ভীষণ পরিপাটি দেখানোর চেষ্টা করত। তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রেখেছিল এটা দেখাতে যে, দেশ স্বাভাবিক রয়েছে। যা কিছু ঘটছে, তা স্রেফ বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সারা দেশেই যেহেতু যুদ্ধ চলছিল তাই দেশের মানুষ হারে হারে জানত কী ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চলছে সারা দেশে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চেষ্টা ছিল মূলত বিদেশের মানুষদের বোঝানো যে, পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশে) সবকিছু স্বাভাবিক চলছে। এই ভুল ধারণা বদলে দেওয়ার কাজও করতেন মুক্তিযোদ্ধারা। তারা এমন আক্রমণ করতেন যে, সেটি ধামাচাপা দেওয়া খুব কষ্টকর হয়ে যেত। তেমনি একটি আক্রমণ ছিল ‘হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল অপারেশন’। বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল আলমের জবানীতে (বীরপ্রতীক) এই অপারেশনের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেছেন লেখক ও গবেষক সালেক খোকন। ঢাকায় কীভাবে এলেন, কীভাবে লুকিয়ে থাকলেন, কীভাবে গাড়ি সংগ্রহ করলেন, কীভাবে আক্রমণ করলেন, পাকিস্তানি সেনাদের নাস্তানাবুদ করে কীভাবেই বা পালিয়ে গিয়ে অপারেশন সমাপ্ত করলেন তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে ‘১৯৭১ : রণাঙ্গনের লড়াই’ বইটির প্রথম শিরোনামের লেখাটিতেই। শুধু ঢাকার ঘটনাই নয়, বরিশাল, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার কোথায় না লড়েছেন আমাদের বীর সেনানিরা? চারশ পঁচাশি পৃষ্ঠার বইটির প্রতিটি ছত্রে ছত্রে লেখা রয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা আর সাধারণ মানুষের অপরিমেয় ত্যাগ।

বইটি তোমাদের ভালো তো লাগবেই, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে বইটি পড়া তোমাদের কর্তব্যও।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে দেশ রূপান্তরে, প্রকাশকাল: ৫ ডিসেম্বর ২০২৫

© 2025, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button