বাঁচার জন্য কলাগাছ ভেবে জড়িয়ে ধরেছিলাম লাশ

‘মানুষের চর্বির গন্ধটা শরীরে লেগে ছিল অনেক দিন’
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের যুদ্ধের ধরন ছিল স্পষ্ট- হিট অ্যান্ড রান, খাঁটি গেরিলা ট্যাকটিক্স। রাতের আঁধারে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে আঘাত করে দ্রুত সরে পড়তাম। এরপর ওরা সারারাত গুলি চালাত অন্ধের মতো। এই ছিল কৌশল। ওয়ান হিট, হানড্রেড রিটার্ন। আমরা একবার আঘাত করতাম, আর ওরা শত শত গুলি নষ্ট করত। এতে ওদের মানসিক চাপ যেমন বাড়ত, তেমনি অস্ত্র ও গোলাবারুদের অপচয়ও হতো।
বীরপ্রতীক আনিসুর রহমান বলছিলেন, সাধারণ মানুষই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা খাবার দিয়েছে, আশ্রয় দিয়েছে, খবর দিয়েছে। সবকিছু নিঃশর্তভাবে। জামালপুরের সরিষাবাড়ীর কবলিবাড়ির চরে ছিল তাদের একটি ক্যাম্প। সেখানে অস্থায়ী ঘর আর খামার থাকায় গোটা চরটাই ছিল আত্মগোপনের জন্য নিরাপদ। চরজুড়ে বিভিন্ন বাড়িতে তারা ছড়িয়ে থাকতেন। রাতে বের হতেন অপারেশনে, দিনের আলোয় থাকতেন অচেনা মানুষের মতো।
রাতভর গোলাগুলি হতো। সকালে দেখা যেত, গ্রামের মানুষ বলাবলি করছে, “আইজ রাইতে তো অনেক গুলি ফুটাইছে। এহানে কে আইছিল?” কেউ কেউ গর্ব করে বলত, “আনিস কোম্পানি।” এই কথাগুলোই তাদের সাহস জোগাত। বাঁচব কি মরব, সে হিসাব তখন মাথায় আসত না। বুকের ভেতর একটাই চিন্তা- কবে এই দেশ থেকে পাকিস্তানিদের তাড়ানো যাবে, কবে দেশটা স্বাধীন হবে।
এই স্মৃতিচারণ বীরপ্রতীক আনিসুর রহমানের। তিনি কথা বলতে বলতে বারবার থামছিলেন, যেন স্মৃতিগুলো এখনো শরীরের ভেতর আটকে আছে। ১৯৭১ সালে বাহাদুরাবাদ ঘাটে চালানো একটি দুর্ধর্ষ অপারেশনের কথা তিনি আলাদা করে বললেন। সেই অপারেশনে ঘাটে নোঙর করা চারটি ফেরি ও পাকিস্তানি সেনাদের একটি স্টিমার ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
বাহাদুরাবাদ ঘাট জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ঘাট ছিল যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিপরীত দিকে ফুলছড়ি ঘাট। ভারতের মেঘালয়, কোচবিহার ও দার্জিলিং থেকে নদীপথে মুক্তিযোদ্ধারা এই এলাকা দিয়েই দেশের ভেতরে ঢুকতেন। সে কারণেই বাহাদুরাবাদ ঘাটে পাকিস্তানি সেনাদের ছিল কড়া নজরদারি। নৌকা এলেই তারা আটকাত।
সেপ্টেম্বরের শেষের দিকের কথা। তখন তাদের ক্যাম্প কবলিবাড়ির চরে। একদিন নেভাল কমান্ডোর চারজন সদস্য এসে আনিসুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা বাহাদুরাবাদ ঘাটে অপারেশনের পরিকল্পনার কথা জানান এবং সহায়তা চান। এই ঘাট আগেই তাদের টার্গেট তালিকায় ছিল।
সবাইকে একসঙ্গে জড়ো করা হলো। প্রশ্ন ছিল একটাই, “কে কে যাবে? ফিরে নাও আসতে পারো।” কেউ পেছাতে চায়নি। শেষ পর্যন্ত তিনজনকে বেছে নেওয়া হয়। নেভালের চারজনসহ মোট আটজন। নৌকা নেওয়ার সুযোগ ছিল না। গভীর রাত, প্রায় দুইটার দিকে ছোট কলাগাছের ভেলায় উপুড় হয়ে ভেসে ভেসে তারা ঘাটের দিকে এগোন। প্রায় এক ঘণ্টা পর পৌঁছে যান লক্ষ্যে।
ঘাটে তখন চারটি ফেরি আর একটি স্টিমার নোঙর করা। নেভাল কমান্ডোর চারজন নিঃশব্দে মাইন ফিট করেন। বাকিরা সহযোগিতায় থাকে। কাজ শেষ হতেই সবাই দ্রুত সরে যেতে শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিকট বিস্ফোরণ, ফেরি আর স্টিমার পানির মধ্যে তোলপাড় তুলে ডুবে যেতে থাকে। পাকিস্তানি সেনারা ছোটাছুটি শুরু করে, এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। সেই মুহূর্তে সবাই পানিতে ছড়িয়ে পড়ে, বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
নেভালের সদস্যরা দ্রুত তীরে উঠতে পারলেও আনিসুর রহমান তখনও নদীতে। শীতের রাত। ঠান্ডা পানিতে ভাসতে ভাসতে তিনি অন্যদের খুঁজছিলেন- কে কোথায় গেল, কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। হঠাৎ দূরে একটা আলো দেখতে পেলেন। পরে বুঝেছেন, তার সহযোদ্ধারাই তীরে উঠে খড়ের পুঁটলি বানিয়ে তাতে আগুন জ্বালিয়ে নদীর পাড় ধরে এগোচ্ছিল, তাকে খোঁজার জন্য।
ঠান্ডা আর ক্লান্তিতে শরীর নিস্তেজ। সাঁতার কাটার শক্তি প্রায় শেষ। কষ্টে কষ্টে আলোর দিকে এগোতে গিয়ে দেখলেন পাশে একটা কলাগাছের মোড়া ভেসে যাচ্ছে। ভেবেছিলেন সেটাকে ধরেই তীরে উঠবেন। মোড়াটাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই বুঝে গেলেন, এটা কলাগাছ নয়। “তখনই বুঝছি, এইডা লাশ,” বলছিলেন বীরপ্রতীক আনিসুর রহমান।
লাশটা কয়েকদিন আগেই মারা গেছে। পেট ফুলে পচে গেছে। শরীর থেকে বের হওয়া চর্বি আর পচা তেলের মতো তরল তার সারা গায়ে লেগে যায়। একটু পর সহযোদ্ধারা তাকে তুলে নেয়। ক্যাম্পে ফিরিয়ে গরম পানিতে সাবান মিশিয়ে গা ধোয়ানো হয়- একটার পর একটা সাবান। তবু শরীর কাঁপছিল ঠান্ডায়। সেই রাতটা তিনি কাটান খড়ের পালার ভেতর শুয়ে।
মানুষের শরীরের চর্বির সেই গন্ধ বহুদিন তার শরীর ছেড়ে যায়নি। মুক্তিযোদ্ধা আনিসুর রহমান থামেন। বলেন, “একাত্তরের এইসব ঘটনা কীভাবে ভুলি বলেন?”
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫
© 2025, https:.




