পাকিস্তানিগো নির্যাতনে পেটের সন্তানটা পেটেই মরছে

“ওই ক্যাম্পেই মরা বাচ্চা হইছিল। তহন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছি, ভাবছি নিজেও বাঁচমু না।”
আমার বাবা ছিলেন নৌকার মাহাজন। পাঁচ-সাতশ মনি নৌকা ছিল তার। যহন ক্লাস এইটে পড়ি তহনই আমার বিয়ে হয়। একই গ্রামে ওরা মোল্লা গুষ্টি আর আমরা ছিলাম শেখ গুষ্টি। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে চইলা যাই খুলনায়। এরপর যহন গর্ভবতী হলাম তহন শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। স্বামী ছিল পাকিস্তানিগো পক্ষে। সে আমারে গর্ভবতী অবস্থায় পাঠায়া দেয় বাবার বাড়িতে।
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার তাড়াইল গ্রামের মেয়ে শেখ ফাতেমা আলী, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এভাবেই শুরু করেন। তার বাবা ছিলেন এলাকার প্রভাবশালী নৌকার মহাজন, শেখ আতিয়ার রহমান। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু সুখের মুখ দেখা হয়নি। স্বামী ছিল পাকিস্তানি ঘেঁষা, তাই একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে গর্ভবতী ফাতেমাকে সে পাঠিয়ে দেয় বাবার বাড়িতে।
কিন্তু সেখানেও কি নিরাপদ আশ্রয় ছিল? বাবার অপরাধ ছিল তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মানুষ, মুক্তিযোদ্ধাদের অকাতরে সাহায্য করতেন। সেই অপরাধের জেরে রাজাকারদের তথ্যে পাকিস্তানি বাহিনী একদিন হানা দেয় তাদের বাড়িতে। চোখের সামনে পুড়িয়ে দেয় সাজানো সংসার, আর নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে ফাতেমার চার ভাই- শেখ ফরিদ, শেখ মনসুর আলী, শেখ জুবায়ের হোসেন, শেখ জাকির হোসেন এবং আদরের ছোট বোন নাজমাকে।
প্রাণভয়ে বাকিরা আশ্রয় নিয়েছিলেন বাবার গয়নার নৌকায়। রামদে বাজারের কাছে সেই নৌকাতেই কাটছিল তাদের অনিশ্চিত জীবন। ফাতেমা আলীর স্মৃতিতে সেই দিনের কথা আজও দগদগে।
তিনি বলেন, “একদিন আমি আর বাবায় নৌকায়। ভাত রান্না হইছে, মাড় গালছি। ঠিক তহনই গ্রামের রাজাকাররা আমগো নৌকাটা আর্মিগো দেখায়া দেয়। পাকিস্তানি আর্মিরা পিঁপড়ার মতো আইসা নৌকার ভেতর ঢোকে।”
তারপর শুরু হয় এক নারকীয় তাণ্ডব। হানাদাররা বয়োজ্যেষ্ঠ বাবাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করতে থাকে। বাবার আর্তনাদ শুনে মেয়ে ছুটে এলে, পাষণ্ডরা বাবার চোখের সামনেই মেয়ের ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন।
ফাতেমা বলেন, “বাবারে মারতে থাকে, আর আমার দিকে তাকায় না বইলা ওরা তারে আরও মারে। তহন হাউমাউ করে চিৎকার দিয়া কাঁদেন তিনি। মেয়েকে নির্যাতনের কষ্ট সহ্য করা তো বাবার পক্ষে কঠিন। কিন্তু আমারে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও তিনি পারেন নাই।”
সেই নরক থেকে বাঁচতে মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন ফাতেমা। সুযোগ বুঝে নৌকা থেকে নেমে দৌড় দিয়েছিলেন, কিন্তু রেহাই মেলেনি। হানাদারদের গুলিতে বিদ্ধ হয় তার পা, আর গোড়ালি ভেদ করে চলে যায় আরেকটি গুলি। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয় তার বুক ও শরীর। জ্ঞান হারান ফাতেমা। জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে আবিষ্কার করেন যশোরের শার্শার বাগআঁচড়া গ্রামের এক আর্মি ক্যাম্পে।
সেই ক্যাম্পের দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে শিউরে ওঠেন এই বীর নারী। তিনি জানান, সেখানে তার মতো আরও এক-দেড়শ নারী বন্দি ছিলেন। দিনরাত চলত পালাক্রমে ধর্ষণ আর নির্যাতন। শরীরের এমন কোনো স্থান নেই যেখানে সিগারেটের আগুনের ছ্যাঁকা দেওয়া হয়নি। খেতে দেওয়া হতো না, পানির তৃষ্ণায় ছটফট করলে চোখের সামনে পানি ফেলে দিয়ে প্রস্রাব খেতে বাধ্য করা হতো।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে তার গর্ভের সন্তানকে নিয়ে। ফাতেমা বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, “গর্ভবতী জেনেও ওরা আমার ওপর নির্যাতন করা বন্ধ রাখে নাই। শেষের দিকে পাকিস্তানি আর্মির নির্যাতনেই পেটের সন্তানটা পেটেই মরছে। ওই ক্যাম্পেই মরা বাচ্চা হইছিল। তহন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছি, ভাবছি নিজেও বাঁচমু না।”
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফাতেমা যখন ফিরে আসেন, তখন আরেক যুদ্ধ অপেক্ষা করছিল তার জন্য। পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবা আর সন্তানহারা মায়ের কাছে ফিরেও তিনি পেলেন না স্বস্তির আশ্রয়। তৃষ্ণার্ত মেয়েকে মা এক গ্লাস পানি দিতে গেলে গ্রামের মানুষ তা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলে। তাদের ফতোয়া- ও গ্লাস ‘নাপাক’ হয়ে গেছে। সমাজপতিরা বাবাকে সমাজচ্যুত করার হুমকি দেয়।
চোখের জল শুকিয়ে যাওয়া এই মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠে শোনা গেলো শুধুই হাহাকার। তিনি বলেন, “আপনারা সবাই তো স্বাধীন দেশ পাইছেন। কিন্তু নির্যাতন সহ্য করে যেই দেশ আমি পাইলাম, সেই দেশে নিজেই হইছি পরবাসী। নিজের বাড়িতেই আমার ঠাঁই হয় নাই। এই দুঃখ আমি কীভাবে ভুলব?”
একাত্তরের সেই বিভীষিকা আজও ঘুমের মধ্যে তাড়া করে ফাতেমা আলীকে; দুঃস্বপ্নে চমকে উঠে তিনি ভাবেন, এই বুঝি আবার শুরু হলো সেই নির্যাতন।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ৪ ডিসেম্বর ২০২৫
© 2025, https:.




