পাকিস্তানরে ভালোবাসেন? বলেই বাবার বুকে স্টেনগান চালিয়ে দিল ছেলে

পাকিস্তানিদের হাতে দুই ছেলেকে হারানো মায়ের সামনে বিচার হলো পিস কমিটির চেয়ারম্যানের।
মুক্তিযুদ্ধে মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির ছিলেন ফোর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের আলফা কোম্পানিতে। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার বাউতলা গ্রামে। একবার এক অপারেশনে টেন ইস্ট বেঙ্গলের অনেক সেনা শহীদ হন। তখন ফোর বেঙ্গল থেকে হুমায়ুনসহ ৪-৫টি কোম্পানিকে টেন বেঙ্গলে যুক্ত করা হয়। এখানে হুমায়ুন ছিলেন ‘সি’ অর্থাৎ চার্লি কোম্পানিতে।
বেলুনিয়া মুক্ত করার পর নির্দেশ আসে ছাগলনাইয়া থানায় পাকিস্তানিদের ডিফেন্স দখল করার। এ দায়িত্ব দেওয়া হয় সি কোম্পানিকে।
মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির সেই অপারেশনের বর্ণনা দেন এভাবে, “আমরা প্রথমে রেইকি করি। এক রাতে থানার ৫০০ গজের ভেতরে পজিশন নিই। টের পেয়ে পাকিস্তানি সেনারা গুলি ছুঁড়তে থাকে। আমরা তখনও চুপ, অর্ডারের অপেক্ষায় আছি। ওদের ফায়ারের পর শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। রাত তখন তিনটা। বৃষ্টিও শেষ, শত্রুর বাঙ্কার থেকে গুলি আসাও বন্ধ।”
“ক্যাপ্টেন দিদার বললেন, ‘ফায়ার’। ভেজা অবস্থাতেই আমরা ফায়ার ওপেন করি। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো জবাব নেই। এবার তিনি বললেন, ‘চার্জ’। আমরা দৌড়ে ওদের বাঙ্কারগুলোতে গিয়ে দেখি গলা-সমান পানি। ওরা সব পালিয়েছে। একাত্তরে এভাবেই বৃষ্টি দিয়ে আল্লাহ আমাদের সহায়তা করেছেন।”
“পুকুর পাড়ের একটা বাঙ্কারে পানি ঢোকেনি। শত্রু আছে ভেবে আমি বেয়নেট ফিক্সড করে চার্জ করতে এগোই। হঠাৎ ভেতর থেকে এক নারী বেরিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। পরনে তার ব্লাউজ আর পেটিকোট। পেটিকোটটি রক্তে ভেজা। তিনি আমাকে ইন্ডিয়ান আর্মি ভেবেছিলেন। বললেন, ‘মুজে একটা গুলি কর’।”
“আমি বললাম, ‘বোন, আমি মুক্তিবাহিনী’। এ কথা শুনে তিনি আমার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। এরপর আমাকে জড়িয়ে ধরে সে কী কান্না! কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘এরে মুক্তিবাহিনী, তোর আল্লার দোহাই লাগে, আঁরে এউগ্গা গুলি করি দে। তোর শেখ মুজিবের দোহাই লাগে, আঁরে এউগ্গা গুলি করি দে’।”
“অগত্যা তাকে নিয়ে গেলাম দিদার সাহেবের কাছে। তিনি সব খুলে বললেন। জানলাম, তার স্বামী ছিলেন আর্মিতে, এখন কোথায় আছেন জানেন না। আর তার দুই ছেলেকে পিস কমিটির চেয়ারম্যান নিজে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিয়েছে। ওরা ছেলে দুটোকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মায়ের চোখের সামনেই হত্যা করেছে।”
“এরপর চেয়ারম্যান তাকে পাকিস্তানিদের বাঙ্কারে দিয়ে আসে। প্রতিদিন পাকিস্তানি সেনারা তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে। তাই তিনি আর বেঁচে থাকতে চান না। আকুতি জানিয়ে বললেন, ‘আই সিপাহির বউ, স্যার। আন্নে আঁরে গুলি করি দেইন’।”
“তার কথা শুনে আমাদের চোখ জলে ভরে ওঠে। শরীরের রক্ত টলমল করে ওঠে ঘৃণায়। দিদার সাহেবও স্থির থাকতে পারলেন না। আটজনকে সঙ্গে দিয়ে আমাকে নির্দেশ দিলেন ছাগলনাইয়ার ওই পিস কমিটির চেয়ারম্যানকে ধরে আনার জন্য। ওই বীরাঙ্গনা বোনকেও সঙ্গে নিয়ে আমরা গেলাম বেলতলী গ্রামে।”
“বিশাল এক বাড়ি। বড় বড় ছয়টা ঘর। উঠানে বহু নারকেল গাছ, গোয়ালে অনেক গরু। পিস কমিটির চেয়ারম্যানের বাড়ি যেন জমিদার বাড়ি। আমাদের শব্দ পেয়ে চেয়ারম্যান খাটের নিচে লুকিয়ে ছিল। পা ধরে টেনে বের করতেই অবাক হলাম। ওই মহিলার বর্ণনা আর এই লোকের চেহারা দেখে বিশ্বাস করার উপায় নেই যে, সে এমন জঘন্য অপরাধ করতে পারে। ইয়া বড় দাড়ি, নুরানি চেহারা, গায়ে বড় জুব্বা, মাথায় টুপি, হাতে তসবিহ।”
“লোকটিকে দেখিয়ে মহিলা বললেন, ‘ইজ্জাই চেয়ারম্যান’।”
“উঠানে একটা নারকেল গাছের সঙ্গে তাকে আমরা বেঁধে ফেলি। বন্দুক তার দিকে তাক করা। হঠাৎ পেছন থেকে একজন দৌড়ে এসে বলেন, ‘রাখেন ভাই। আমার বাপ। আমি মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধা।’”
“তিনি ছিলেন ওই এলাকার গেরিলা, নাম নুরুজ্জামান। তিনি ওই বীরাঙ্গনার স্বামীর বন্ধুও। তাকে দেখে ওই নারী কান্নাজড়ানো কণ্ঠে বলেন, ‘নুরুজ্জামান, তুই এক্কানি চা। আঁর পেটিকোটে রক্তের দিক এক্কানি চা। আজ দশ দিন আমি বাঙ্কারে। তোর আব্বা আঁরে ওগো হাতে তুলি দিছে। আঁর পোলা দুইডারেও ওরা মারছে। তুই আঁরে এউগ্গা গুলি করি দে। আঁর কোনো দাবি থাইকত ন’।”
“স্টেনগানটি নুরুজ্জামানের হাতেই ছিল। ওই নারীর কথায় তার শরীর কাঁপছিল। সব শুনে তিনি শুধু বললেন, ‘আব্বা, আপনে এই কাজ করলেন! আপনে পাকিস্তানরে ভালোবাসেন, তাই বইলা আমগো একটা বোনরে ওগো হাতে তুইলা দিতেন!’”
“পিস কমিটির চেয়ারম্যানের মুখে কোনো উত্তর নেই। চোখের নিমিষে নুরুজ্জামান স্টেনগানের ট্রিগার চেপে ধরেন। চেয়ারম্যানের বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায়। যুদ্ধাপরাধী পিতার রক্তেই ভিজে গিয়েছিল ওই মুক্তিযোদ্ধার মুখটি।”
দেশের জন্য একাত্তরে যুদ্ধাপরাধী পিতাকেও ক্ষমা করেননি মুক্তিযোদ্ধারা। এ রকম অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার দেশপ্রেমের কারণেই আমরা পেয়েছি স্বাধীনতার স্বাদ।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ৫ ডিসেম্বর ২০২৫
© 2025, https:.




