সেপ্টেম্বর ১৯৭১: দিশেহারা পাকিস্তানি আর্মি
মুক্তিযুদ্ধ ছিল নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণে পুরোপুরি একটি জনযুদ্ধ। সেপ্টেম্বর থেকেই মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ, সাহসী নারী ও কিশোরদের ঐক্যবদ্ধ আক্রমণেই দিশেহারা হতে থাকে পাকিস্তানি সেনারা।
মুক্তিযুদ্ধ চলছে তখন। দেশের ভেতরে মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ। সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলতাফ মাহমুদ তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তার সুরে অজস্র দেশাত্মবোধক গান প্রচারিত হয়। পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজেও।
একাত্তরে তার ৩৭০ আউটার সার্কুলার রোড রাজারবাগের বাসাটি ছিল ঢাকার গেরিলাদের অন্যতম গোপন ক্যাম্প। যেখানে লুকিয়ে রাখা হয় বেশকিছু অস্ত্র ও গ্রেনেডভর্তি দুটো ট্রাংক। ৩০ অগাস্ট ভোরে পাকিস্তানি সেনারা ওই বাসা থেকে আলতাফ মাহমুদসহ তার চার শ্যালক লিনু বিল্লাহ, দিনু বিল্লাহ, নুহে আলম বিল্লাহ, খাইরুল আলম বিল্লাহ ও শিল্পী আবুল বারক আলভীকে আটক করে। অতঃপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় নাখালপাড়ার ড্রাম ফ্যাক্টরি সংলগ্ন এমপি হোস্টেলে, মিলিটারি টর্চার সেলে। চলে পৈশাচিক নির্যাতন। আলতাফ মাহমুদ সবাইকে বাঁচাতে অস্ত্র রাখার সমস্ত দায় নিজের ওপর নিয়ে নেন। ফলে সেপ্টেম্বরের এক তারিখে তিনি ছাড়া বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
ওইদিনের পর আলতাফ মাহমুদসহ ঢাকার গেরিলা রুমী, আজাদ, বকর, জুয়েল, বদী, হাফিজের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয় সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই তাদের মেরে ফেলা হয়েছে। (তথ্যসূত্র: ‘একাত্তরের দিনগুলো’, জাহানারা ইমাম; ‘আলতাফ মাহমুদ এক ঝড়ের পাখি’, মতিউর রহমান)
ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত হয়েছে প্রিয় স্বাধীনতা। ওই রক্তে মিশে আছে মৃত্যুর তারিখহীন ও কবরহীন একজন আলতাফ মাহমুদের রক্তও। যা কোনোভাবেই ভুলে যাওয়ার নয়।
সেপ্টেম্বর থেকেই পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ বাড়ছিল। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক বাহিনীগুলোও এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এসব বাহিনীর মধ্যে টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনী, সিরাজগঞ্জের লতিফ মির্জা বাহিনী, ঝিনাইদহের আকবর হোসেন বাহিনী, ফরিদপুরের হেমায়েত বাহিনী, বরিশালের কুদ্দুস মোল্লা বাহিনী ও গফুর বাহিনী এবং ময়মনসিংহের আফসার বাহিনী ও আফতাব বাহিনী উল্লেখযোগ্য।

কাদেরিয়া বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন আবদুল কাদের সিদ্দিকী। তিনি বঙ্গবীর নামে অধিক পরিচিত এবং একাত্তরে সাহসীকতার জন্য পরে বীরউত্তম খেতাবও লাভ করেন। ১৮ হাজার সশস্ত্র যোদ্ধা আর ৭২ হাজার স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে তৈরি করেন বাহিনীটি।
টাঙ্গাইলের সখীপুরে দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় ছিল কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীর সদর দপ্তর, আন্ধি গ্রামে ছিল প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। এ বাহিনী পরিচালিত হতো সামরিক কায়দায়। সেখানে অর্থ বিভাগ, জনসংযোগ বিভাগ, রেডিও-টেলিফোন যোগাযোগ বিভাগ, খাদ্য বিভাগ এবং বিচার ও কারা বিভাগও ছিল।
কাদেরিয়া বাহিনীর সদস্যরা দেশের ভেতরেই প্রশিক্ষণ নেন। গেরিলা যুদ্ধ সাধারণত ‘হিট অ্যান্ড রান’ পদ্ধতিতে হয়ে থাকে। কিন্তু এ বাহিনী ‘হঠাৎ আঘাত, অবস্থান এবং অগ্রসর’ পদ্ধতি অনুসরণ করে গেরিলা যুদ্ধের নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছিল। টাঙ্গাইলের পাশাপাশি ঢাকা, ময়মনসিংহ জামালপুর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় অসংখ্য অপারেশন পরিচালনা করে এ বাহিনীটি। (তথ্যসূত্র: ‘স্বাধীনতা ’৭১’, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম)
পাকিস্তানি সেনাদের ওপর এয়ার অ্যাটাকের জন্য ট্রেনিংয়ের পরিকল্পনা করে মুজিবনগর সরকার। ২৮ সেপ্টেম্বর মুক্তিবাহিনীর ডিপুটি চিফ অফ স্টাফ এ কে খন্দকারের নেতৃত্বে ৯ জন পাইলট ও ৪৭ জন গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারের সমন্বয়ে গঠন করা হয় মুক্তিবাহিনীর এয়ার উইং। যা কিলো ফ্লাইট গ্রুপ নামে অধিক পরিচিত।
ভারত সরকার যুদ্ধের জন্য বাংলাদেশকে ৩টি বিমান দিলে সেগুলো সম্পর্কে ধারণা দিতে ভারতীয় প্রশিক্ষক স্কোয়াড্রন লিডার সঞ্জয় কুমার চৌধুরী ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ঘোষালের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় ট্রেনিং। কিলো ফ্লাইট গ্রুপে যুক্ত ছিলেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা রুস্তম আলী বীরপ্রতীক।
ওই ট্রেনিং সম্পর্কে তিনি ধারনা দিয়েছেন এভাবে, “আমি তখন আগরতলায়, হোল্ডিং ক্যাম্পে। সঙ্গে খন্দকার আর সার্জেন্ট মনির। ক্যাম্প থেকেই বাছাই করে নেওয়া হয় আমাদের। অতঃপর আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ডিমাপুরে, আসামের নাগাল্যান্ডে। চারিদিকে পাহাড়। মাঝখানে একটি ব্রিটিশ আমলের রানওয়ে। সেখানেই কয়েক মাস চলে ট্রেনিং।”
যুদ্ধে ব্যবহৃত বিমানগুলো নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও বলেছেন এভাবে, “আমাদের একটা এলইউট আর ছিল একটা অর্টার। এলইউট হলো হেলিকপ্টার। আর অর্টার হচ্ছে বিমান। একটি বিমানে রকেট, বোম্বিং, গানারিং—এই তিনটা সেট করা থাকত। আমি ছিলাম এয়ার গানার। বিমানবাহিনীর তৎকালীন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম বীরউত্তম ছিলেন পাইলট। কো-পাইলট ক্যাপ্টেন আকরাম। আমি এয়ার গানার আর সার্জেন্ট হক ছিলেন বোম ড্রপিংয়ের দায়িত্বে।
ট্রেনিংয়ের সময় পাহাড়ের মধ্যে আমাদের টার্গেট দেওয়া হতো। সেটি ধ্বংস করতাম। এলইউট বা হেলিকপ্টারের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ আর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বদরুল আলম। আরেকটা বিমান ছিল ডাকোটা। সেটার পাইলট ছিলেন ক্যাপ্টেন খালেক। সঙ্গে ক্যাপ্টেন সাহাবুদ্দিন ও আব্দুল মুহিতও। সবাই ছিলাম সুইসাইডাল স্কোয়াডের সদস্য। এই কিলো ফ্লাইট গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন সুলতান মাহমুদ।”
বাংলাদেশের গণহত্যার বিরুদ্ধে ও স্বাধীনতার পক্ষে দাড়িয়েছিলেন ভিনদেশীরাও। বিদেশের মাটিতে তাদের নানা কর্মসূচিগুলো বিশ্বজনমত তৈরিতে সহায়ক হয়েছিল।
মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব আর্টসে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন শিক্ষক ছিলেন হার্ব ফিথ। এবিসির আন্তর্জাতিক ব্রডকাস্টিং সার্ভিস রেডিও অস্ট্রেলিয়াই প্রথম বিদেশি মিডিয়া, যেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাসহ গণহত্যার নানা খবর প্রচারিত হতো। ওই খবরগুলোই স্পর্শ করে হার্ব ফিথ ও তার বন্ধুদের। তারা ফিথকে প্রধান করে গঠন করে ‘ভিক্টোরিয়ান কমিটি টু সাপোর্ট বাংলাদেশ’ নামে একটি কমিটি। এর সদস্যরা বাংলাদেশে গণহত্যার বিরুদ্ধে বিভিন্ন তথ্য লিফলেট, পোস্টার ও সেমিনারের মাধ্যমে প্রচার করে এবং বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়াতে অস্ট্রেলিয়ান সরকারকে চাপ দিতে থাকে।
একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসে ফ্লিন্ডার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘এশিয়া ফ্ল্যাশপয়েন্ট, ১৯৭১: বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি বক্তব্যও প্রদান করেন হার্ব ফিথ। সেখানে বাংলাদেশে পঁচিশে মার্চ রাতের গণহত্যাকে ১৫৭২ সালের সেন্ট বার্থোলেমিড গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করেন নিন্দা জানান তিনি।
এছাড়া ওই সময় বাংলাদেশের পক্ষে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে জনমত গড়ে তুলেছিলেন একদল অ্যাকটিভিস্ট। গণহত্যার প্রতিবাদে তারা মেলবোর্ন থেকে ক্যানবেরায় অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্ট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয়শ কিলোমিটার দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ডেভিড এলিসসহ মাইক ক্রেমার, ডক্টর অ্যালেক্স রস প্রমুখ।
সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর/এত এত শুধু মানুষের মুখ/ যুদ্ধ মৃত্যু তবুও স্বপ্ন ফসলের মাঠ ফেলে আসা সুখ…। শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, আজও শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের পক্ষে উচ্চারিত হয় অ্যালেন গিন্সবার্গের লেখা কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। একাত্তরে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। কিন্তু তখন সেদেশের অনেকেই পাকিস্তানের নারকীয় হত্যাকাণ্ড সমর্থন করেননি। বরং তারা বাংলাদেশের অসহায়, নির্যাতিত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ তেমনই একজন। বাংলাদেশ সীমান্ত যশোর ঘুরে অসহায় শরণার্থীদের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করেছিলেন এ কবি।
একাত্তরের সেপ্টেম্বরে কলকাতায় আসেন গিন্সবার্গ। তার সঙ্গী হন বিবিসির হয়ে রিপোর্ট করতে আসা গীতা মেহতা ও সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাদের নিয়ে যশোরসহ বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ঘুরে দেখেন গিন্সবার্গ। শরণার্থীদের কষ্টকর জীবন দেখে তার হৃদয় কেঁদে ওঠে। প্রতিবাদী গিন্সবার্গ এরপর নিউইয়র্ক ফিরে গিয়েই লিখেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ শিরোনামে তার অমর কবিতাটি। যাতে বাংলাদেশের নির্যাতিত মানুষের কথাই তুলে ধরা হয়েছিল।
২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ও সমর্থন প্রকাশ করে ঢাকায় বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধি টাইগারম্যান পদত্যাগ করেন। এছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করায় পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসের ৬ অফিসারকে বরখাস্ত করা হয়। এরা হলেন, ইরাকের বাগদাদে পাকিস্তানের হাইকমিশনার এ এফ এম আবুল ফাত্তাহ, কলকাতাস্থ ডেপুটি হাইকমিশনার হোসেন আলী, জাতিসংঘের সহকারী স্থায়ী প্রতিনিধি এস এ করিম, ওয়াশিংটনের কাউন্সিলার এস এ এম এস কিবরিয়া, থার্ড সেক্রেটারি মহিউদ্দিন আহমদ ও আনোয়ারুল করিম। এ সব ঘটনার সংবাদ বিশ্ব গণমাধ্যমে উঠে আসে। যা পাকিস্তান সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতাকেই বিশ্বের কাছে স্পষ্ট করে।
এদিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্র হাতে রণাঙ্গণে যুদ্ধ করেছেন কাঁকন বিবি, তারামন বিবি, শিরিন বানু মিতিল, আশালতা বৈদ্য প্রমুখ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গোবরা ক্যাম্পটি শুধু নারীদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্যই চালু করা হয়। ওই ক্যাম্পটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী সাজেদা চৌধুরী। সেখানে সিভিল ডিফেন্সের প্রশিক্ষক ছিলেন শিপ্রা সরকার ও সেবা চৌধুরী। নার্সিং শেখাতেন ডা. মীরালার ও ডা. দেবী ঘোষ। অস্ত্র চালনা ও গেরিলা আক্রমণ শেখাতেন ক্যাপ্টেন এস এম তারেক ও মেজর জয়দীপ সিং।
সেপ্টেম্বরে শুরু হয় নয় নম্বর সেক্টরে নারীদের একটি গ্রুপের ট্রেনিং। বরিশালের গৌরনদীর গৈইলা গ্রাম থেকে এসে ট্রেনিংয়ে অংশ নেন রমা রানী দাস। কীভাবে যুক্ত হলেন তিনি? রমা রানী দাস যেভাবে বলেছেন, “এক মাসিকে সঙ্গে নিয়ে যাই নয় নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার, হাসনাবাদে। বাস থেকে নামতেই দেখা হয় ক্যাপ্টেন বেগের সঙ্গে। ঝালকাঠির ভীমরুলির পেয়ারা বাগানে যিনি আগেই অস্ত্র চালানো শিখিয়েছিলেন। উনি সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল সাহেবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখে মেজর জলিল খুশি হয়ে বলেছিলেন, ‘আরও বিশ-পঁচিশটা মেয়ে আছে। এই গ্রুপটির দায়িত্ব আপনি নেন।’ তখনই রাজি হয়ে গেলাম। ক্যাম্পের ভেতর এক বাড়ির দোতলাতে থাকতাম। নিচে সেন্ট্রি থাকত। কেউ ভেতরে ঢুকতে পারত না। শুধু সেক্টর কমান্ডার পনের দিন পর পর এসে খোঁজ নিয়ে যেতেন।”
আরও কয়েকজন নারী যোদ্ধার নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বিথিকা বিশ্বাস, হাসি, মিনতি, কনক প্রভা মণ্ডল, সমিরন, হরিমন বিশ্বাস, রুনু দাস প্রমুখ ছিলেন। ট্রেনিং চলে টাকিতে, ইছামতি নদীর পাড়ে। যশোর ক্যান্টনমেন্টের সুবেদার মেজর মাজেদুল হক সাহেব ছিলেন ট্রেনার। রাইফেল, গ্রেনেড, এক্সপ্লোসিভ, স্পাইং—এগুলো ছিল ট্রেনিংয়ের মূল বিষয়।”
আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডালিয়া আহমেদ। একাত্তরে নারীদের অবদান প্রসঙ্গে তিনি অকপটে বলেন, “একাত্তরে নারীরা যে কত রকমভাবে সাহায্য করেছে চিন্তা করা যাবে না। আম্মা রাতভর রান্না করে মুক্তিযোদ্ধাদের খাইয়ে, শুকনো খাবার দিয়ে তাদের পালানোর পথ দেখিয়ে দিতেন। এরকম সাহায্য তো ঘরে ঘরে মা-বোনেরা করেছেন। দেশ থেকে সবাই তো যুদ্ধে চলে গেছে। কিন্তু মায়েরা, বোনেরা এই অবরুদ্ধ বাংলায় চরম নিরাশ্রয় অবস্থায় ছিল। হানাদারদের কাছ থেকে নিজেদের ও শিশুদের বাঁচানোটাই ছিল তখন আরেকটা যুদ্ধ। ওই ইতিহাসের কথা কিন্তু তেমন তুলে ধরা হয়নি। নারী মুক্তিযোদ্ধার আলাদা করে কোনো লিস্ট করা হয়নি। অনেক পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাও এটাকে বড় করে দেখতে চায় না। একাত্তরের নারীদের নিয়ে গবেষণাও কম হয়েছে। এই কাজগুলো না হলে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস হবে না।”
এছাড়া ভারতের শরণার্থী শিবিরে ডাক্তার, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন অসংখ্য নারী। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবেও অংশ নিয়েছেন অনেক নারী শিল্পী। অনেকেই গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করে তা জমা দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের তহবিলে।
আবার মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও নানা খবর দিয়ে স্বাধীনতাকে তরান্বিতও করেছিলেন নারীরা। রণাঙ্গনে বিশেষ ভূমিকার জন্য তারামন বিবি ও ডাক্তার সিতারা বেগম বীরপ্রতীক খেতাব লাভ করেছেন। যা একাত্তরে নারীদের সাহসী ভূমিকাকেই স্পষ্ট করে।
মুক্তিযুদ্ধ ছিল নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণে পুরোপুরি একটি জনযুদ্ধ। সেপ্টেম্বর থেকেই মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ, সাহসী নারী ও কিশোরদের ঐক্যবদ্ধ আক্রমণেই দিশেহারা হতে থাকে পাকিস্তানি সেনারা।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে, প্রকাশকাল: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
© 2025, https:.




