সুসংয়ের হাতি-খেদা বিদ্রোহ: এক উপেক্ষিত অধ্যায়

হাতি ছাড়া সামন্তপ্রথা ছিল অচল। সম্ভ্রান্ত বংশীয়দের কাছেও ঐশ্বর্যের প্রতীক ছিল হাতি
অনেক কাল আগের কথা। ‘সুসং’ ছিল একটি পরগনার নাম। আর জমিদারদের বসবাসের এলাকার নাম দুর্গাপুর। সুসং রাজা বা জমিদাররা ছিল গারো পাহাড়ের বিপুল অরণ্য–সম্পদের মালিক।
সেখান থেকে তাদের প্রচুর আয় আসত। এছাড়া তাদের আরেকটি আয়ের পথ ছিল হাতির ব্যবসা। ওইসময় হাতির কদর ছিল অভাবনীয়। হাতি ছাড়া সামন্তপ্রথা অচল। সম্ভ্রান্ত বংশীয়দের কাছেও ঐশ্বর্যের প্রতীক ছিল হাতি।
গারো পাহাড়ে দলে দলে হাতি স্বাধীনভাবে বিচরণ করত। বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে বন্যহাতিদের ধরার ব্যবস্থা করা হত। প্রচলিত ভাষায় এর নাম ছিল ‘হাতি–খেদা’। শত শত লোক অনেক দূর থেকে হাতির দলকে ঘেরাও করে, উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে এবং নানারকম বিকট আওয়াজ তুলে তাড়া করে নিয়ে আসে।
হাতি ধরায় পারদর্শী ছিল হাজং আদিবাসীরা। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের কথা। সুসং রাজবংশের রাজা তখন কিশোর। হাতি ধরার জন্য তিনি বহু হাজং পরিবারকে দুর্গাপুরের পাহাড়ি অঞ্চলে এনে বসতি করান। তারাই তখন নিজেদের চাষাবাদ বন্ধ রেখে জীবন ঝুঁকিতে ফেলে রাজার হুকুমে বন্যহাতি ধরে দিত।
কীভাবে? পাহাড় অঞ্চলের গভীর অরণ্যের মধ্যে গজারি গাছের খুঁটি দিয়ে একটি বড় স্থানে বেষ্টনী তৈরি করত। তারপর সেখানে লাগানো হতো হাতির প্রিয় খাবার কলাগাছ ও ধান। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় খাবারের সন্ধানে বন্যহাতির দল পাহাড় থেকে দলবেঁধে নেমে আসত। তারা কলাগাছ ও ধানের লোভে ওই বেষ্টনী বা খেদায় প্রবেশ করত।
ঠিক তখনই হাজংরা খেদায় ঢোকার সব পথ বন্ধ করে দিত। তারপর গৃহপালিত ‘কুনকি’ হাতির সহায়তায় বন্যহাতিদের বশে আনত। তারপর তাদের পায়ে শিকল পরিয়ে নিয়ে আসা হত বাইরে। রাজা বা জমিদাররা সেসব হাতি ঢাকা, মুর্শিদাবাদ ও দিল্লী প্রভৃতি অভিজাত জায়গায় বিক্রি করে বিপুল মুনাফা লাভ করে। এভাবে হাতি বিক্রয় করে জমিদাররা প্রতি বছর বহু অর্থ–সম্পদের মালিক বনে যায়।
কিন্তু হাতি ধরার কাজের জন্য হাজংদের কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হতো না। বরং জমিদারগোষ্ঠীর অর্থের লালসা মিটাতে গিয়ে প্রতি বছর বহু হাজং চাষিকে বন্যহাতির পায়ের তলায় জীবন দিতে হয়। আবার হাতি ধরার কাজে না এলে রাজা–জমিদাররা হাজংদের ওপর নানা অত্যাচারও চালাত। এ নিয়ে ধীরে ধীরে হাজংদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে। তারপর উনিশ শতকের প্রথম ভাগে তা বিস্ফোরণে রূপ নেয়। নতুন জীবনের স্বপ্নে এ অঞ্চলের হাজংরা বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়।
ওইসময় হাতি খেদার কাজের জন্য জমিদাররা বাধ্যতামূলক বেগার–প্রথাও চালু করার চেষ্টা করে। ফলে এর বিরুদ্ধে হাজংরা প্রতিবাদ করে। তাদের দমাতে সুসং জমিদাররা নানাভাবে অত্যাচার ও উৎপীড়ন চালানো শুরু করে। জমিদারদের উৎপীড়ন ক্রমেই বেড়ে চলছিল।
হাজংদের সহ্যের সীমাও তখন শেষ হয়ে আসে। তখনই হাজং নেতা মনা সর্দার দুর্গাপুরে ‘হাতি–খেদা’র বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দেন। জমিদারের উৎপীড়নে ওই অঞ্চলের বিক্ষুব্ধ গারো চাষিরাও ওই বিদ্রোহে হাজংদের সঙ্গে যোগ দেয়। ফলে সমগ্র সুসং–পরগনায় বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।
এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে জমিদাররাও। বিদ্রোহের প্রধান নায়ক মনা সর্দারকে তারা কৌশলে আটক করে। তারপর বুনো হাতির পায়ের তলায় ফেলে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। চোখের সামনে মনা সর্দারের মৃত্যুতে ঠিক থাকতে পারে না হাজংরা। জমিদারদের বিরুদ্ধে তারা সর্বশক্তি নিয়ে ফুঁসে ওঠে।
একযোগে তারা সুসং–এর ‘বারোমারি’ ময়দানে আক্রমণ করে জমিদারদের পাইক–বরকন্দাজ বাহিনীর ওপর। সেসময় জমিদারদের হাতিগুলোর হাজং মাহুতরাও তাদের হাতিগুলোকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। ফলে ওই হাতির দলও জমিদার বাহিনীকে আক্রমণ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে জমিদারদের বহু পাইক–বরকন্দাজ হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে মারা যায়।
তারপর হাজং ও গারো কৃষকদের সম্মিলিত বাহিনী সুসং–দুর্গাপুর আক্রমণ করে। জমিদার–পরিবার তখন প্রাণ বাঁচাতে নেত্রকোণা শহরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। বিদ্রোহীরা জমিদারদের অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে বিজয়পুর, ধেনকী, ভরতপুর, আড়াপাড়া, ফারাংপাড়া ও চেংনী প্রভৃতি স্থানের সব ‘হাতি–খেদা’ পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলে।
‘হাতি–খেদা’ বিদ্রোহ চলে প্রায় পাঁচ বছর। বিদ্রোহে বেতগড়ার রাতিয়া হাজং, ধেনকির মঙ্গলা, লেঙ্গুরার বিহারী, হদিপাড়ার বাঘা, ফান্দা–গ্রামের জগ এবং বিজয়পুরের সোয়া হাজং প্রমুখ শহীদ হন। এসময় মলা ও তংলু নামে দুজন বিদ্রোহী নিখোঁজ হন। এছাড়া বিদ্রোহের সময় বাগপাড়ার গয়া মোড়লকে জমিদারদের লোকেরা ধরে নিয়ে যায়।
পরবর্তীতে সে–ও আর ফিরে আসেনি। সুসং পরগনার এই বিদ্রোহের ফলে হাতি ধরার হাতি–খেদা প্রথা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। আজও এ বিদ্রোহ নিয়ে আদিবাসী গ্রামগুলোতে নানা কাহিনি প্রচলিত আছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে যা আগামী প্রজন্মকেও প্রেরণা জোগায়।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজ বিভাগে, প্রকাশকাল:২ আগস্ট ২০২৫
© 2025, https:.




