আলোকচিত্রে ৭১: ক্যামেরা হয়ে উঠেছিল অস্ত্রের সমান

আজ ‘বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস’ উপলক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি আলোকচিত্রীদের স্মরণ করি।
বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস আজ। ১৮৩৯ সালের ১৯ অগাস্ট ফরাসি সরকার এই দিনকে ‘ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি ডে’ হিসেবে ঘোষণা করে।
একটি ছবি অনেক কথা বলে, সময়ের অনেক ঘটনাই তুলে ধরে। একাত্তরে দেশি ও বিদেশি আলোকচিত্রীদের তোলা ছবিগুলো আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য দলিল। এ কারণেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যে সব বিদেশি আলোকচিত্রী জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে ক্যামেরায় তুলে এনেছিলেন ইতিহাস, এদিনে তাদের স্মরণ করতে এই লেখার অবতারণা।
মুক্তিযুদ্ধ চলছিল তখন। পরিবারসহ আলোকচিত্রী কিশোর পারেখ তখন হংকংয়ে। ভারতে জন্ম হলেও বাংলাদেশকে নিজের দেশ বলেই মনে করতেন তিনি। দেশে মানুষ হত্যার নানা সংবাদ তাকে ব্যথিত করে। তারপর একদিন পরিবার ফেলেই চলে আসেন কলকাতায়।

প্রথমে সীমান্তপথে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা চালান কিশোর। কিন্তু কোনোভাবেই তা সম্ভব হয় না। তবুও তিনি হাল ছাড়েন না। একটি ক্যামেরা আর চল্লিশ রোল ফিল্ম নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন। ৮ ডিসেম্বর ১৯৭১। ভারত থেকে একটি সামরিক হেলিকপ্টারে সাংবাদিকদের নেওয়া হচ্ছিল ঢাকায়। কিন্তু অনুমতি না থাকায় কিশোরকে সে হেলিকপ্টারে উঠতে বাধা দেন সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা।
কিশোরের মনে তখন ঝড় ওঠে। বাংলাদেশে যাওয়ার আকুতি জানিয়ে তার উদ্দেশে তিনি শুধু বলেন, “হয় আমাকে সঙ্গে নাও, নয়তো এখানেই গুলি করে রেখে যাও।”
এ কথা শোনার পর ওই সেনা কর্মকর্তা থমকে দাঁড়ান। তারপর কিশোরকে তুলে নেন হেলিকপ্টারে। মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে এভাবেই বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন ভারতের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী কিশোর পারেখ।
ক্রমেই মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে কিশোরের। তাদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে একাত্তরের ছবি তোলেন এই আলোকচিত্রী। শুধু তাই নয়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের পোশাক পরে কিশোর আট দিনে ক্যামেরায় তুলে আনেন মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য ৬৭টি ছবি। সেই ছবিগুলো নিয়ে ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় ‘বাংলাদেশ: অ্যা ব্রুটাল বার্থ’ নামক ছবিগ্রন্থটি। বিজয়ের মুহূর্ত পর্যন্ত কিশোর ছিলেন এ দেশে।

কেমন ছিল একাত্তরের বাংলাদেশ? গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের উত্তর আলোকচিত্রী কিশোর পারেখ দিয়েছিলেন একবাক্যে, এভাবে, “সেখানে আমি শুধু মানুষের পচা মাংসের গন্ধ পেয়েছি।” কোনো আর্থিক লাভ নয়, বরং গণমানুষের যুদ্ধকে ইতিহাসে ধরে রাখতেই মুক্তিযুদ্ধে কিশোরের মতো সাহসী আলোকচিত্রী এ দেশে কাজ করেছেন ক্যামেরা হাতে।
ইরানের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী আব্বাস আত্তার। বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা ফটো এজেন্সি ‘ম্যাগনাম’-এর সঙ্গেই কাটে তার জীবনের বেশিরভাগ সময়। একাত্তরে আব্বাস লাইকা ক্যামেরা হাতে ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশ। এই ক্যামেরাটি ছিল ছোট, শাটার চাপলেও কোনো শব্দ হয় না। ক্যামেরায় তোলা সাদা-কালো ছবি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিয়ে তিনি একাত্তরের বিভীষিকাকে তুলে ধরেছিলেন।
একবার লাইকা ক্যামেরায় ছবি তোলার সময় আব্বাস পাকিস্তানি সেনাদের মুখোমুখি হন। সেনারা তাকে ‘হ্যান্ডস আপ’ বলেই দাঁড় করিয়ে দেয়। তখন নিজের হাতে ধরা ক্যামেরাসহ তিনি দুই হাত উপরে তোলেন এবং ওই অবস্থাতেই ক্যামেরার শাটার চেপে হুকুমদাতা সেনাদের ছবি তুলতে থাকেন। এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি ছবি তুলেছেন ১৬ ডিসেম্বরে আত্মসমর্পণের টেবিল পর্যন্ত।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বগুড়ায় পাকিস্তানি সেনাদের একটি ক্যাম্পে বন্দি ভারতীয় মেজর ফুল সিংয়ের ছবিটি আলোকচিত্রী আব্বাসের তোলা। ঢাকায় বাংলাদেশের নতুন পতাকা সেলাইয়ের ছবি ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কমান্ডার নিয়াজির বেশ কিছু ছবিও তোলেন তিনি। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়োল্লাস ও মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতা সবই ক্যামেরায় ধারণ করেন এই ইরানি আলোকচিত্রী। আব্বাসের তোলা ছবি শুধু ইতিহাসই ধারণ করেনি, বরং নতুন ইতিহাসও তৈরি করেছে, যা আজও মুক্তিযুদ্ধের অকাট্য দলিল।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যার ছবি আমাদের বিবেককে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়, তিনি ভারতীয় আলোকচিত্রী রঘু রাই। তাকে ‘ক্যামেরার কবি’ বলেন কেউ কেউ। ক্যামেরায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, উদ্বাস্তু, পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণ ইত্যাদি তুলে আনার কারণে ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাকে ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কার প্রদান করে।
১৯৭১ সালে রঘু রাইয়ের বয়স ছিল ২৮ বছর। কাজ করতেন স্টেটসম্যান পত্রিকার চিফ ফটোগ্রাফার হিসেবে। ডিসেম্বরে খুলনার সীমান্তপথে যখন ভারতীয় সেনারা বাংলাদেশে ঢুকছিল, তখন তাদের সঙ্গে ক্যামেরা হাতে বাংলাদেশে আসেন রঘু রাই। পাকিস্তানি সেনাদের গুলির মুখেও পড়েন এই আলোকচিত্রী এবং অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। সেসময় ছবির কারিগরি দিকের চেয়ে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন লাঞ্ছিত মানবতার চিত্র তুলে ধরার দিকে।

একটি ছবির পেছনের গল্প গণমাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন ঠিক এভাবে, “ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি হচ্ছে। কর্দমাক্ত যশোর রোড দিয়ে স্রোতের মতো রাত-দিন মানুষ আসছে। মাথায় একটি পুঁটলি। ছোট শিশুটিকে কাঁধে তুলে নিয়েছেন তার বাবা। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের শরীরে সামর্থ্য নেই। কিন্তু তারাও হাঁটছেন ছেলের কাঁধে ভর দিয়ে। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে কাঁদছিল খাবারের জন্য, দুধের জন্য। তারা যেন কিছুই দেখছিল না। শুধুই এগিয়ে চলছিল পায়ে পায়ে। তাদের চোখে-মুখে এমন এক গভীর বেদনার ছাপ, যা আমাকে খুবই বিচলিত করে তুলেছিল।”
একাত্তরে তার প্রতিটি ছবির পেছনেই খুঁজে পাওয়া যায় গণহত্যা, নির্যাতন আর মানুষের আর্তনাদের আরেক গল্প, যা ওই সময় নিয়মিত ছাপা হতো স্টেটসম্যান পত্রিকায়। একাত্তরে রঘু রাইয়ের ছবিগুলোই স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করতে অনন্য ভূমিকা রেখেছিল।
রঘু রাইয়ের মতো ফরাসি আলোকচিত্রী রেমন্ড দেপার্দো একাত্তরে ছবি তুলেছেন যশোরে। ‘কাঁধে রাইফেল ফেলে গ্রামের কাদামাখা পথে একদল মুক্তিযোদ্ধার হেঁটে যাওয়া’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তার একটি বিখ্যাত ছবি। এছাড়া ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর বিখ্যাত যশোর রোডে ভারতীয় একটি ট্যাংকের এগিয়ে যাওয়াকে ক্যামেরাবন্দি করেন এই আলোকচিত্রী। যশোর মুক্ত হওয়ার পর রাইফেল উঁচু করে মুক্তিযোদ্ধাদের উল্লাস করার ছবিটিও তার তোলা। একাত্তরে রেমন্ডের ক্যামেরায় উঠে এসেছে শরণার্থী শিবিরে বাঙালিদের দুর্দশা, আত্মসমর্পণ করা পাকিস্তানি সেনা এবং আটক রাজাকারদের ছবিও।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ উদ্দীপ্ত করেছিল বিশ্বের নারী আলোকচিত্রীদেরও। তাই ক্যামেরায় একাত্তরের বাংলাদেশকে তুলে আনতে এগিয়ে এসেছিলেন নারী আলোকচিত্রী মেরিলিন সিলভারস্টোন। তার জন্ম লন্ডনে। তিনি ফটোসাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন ১৯৫৫ সালে এবং ১৯৬৭ সালে যোগ দেন ম্যাগনাম ফটোজে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মেরিলিন মূলত শরণার্থী শিবিরের বাঙালি নারী ও শিশুদের দুর্দশার চিত্র গুরুত্ব দিয়ে তুলে এনেছিলেন। এছাড়া বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের ছিন্নভিন্ন দেহের একটি ছবিও এই নারী আলোকচিত্রীর তোলা।
মেরিলিনের মতো আমেরিকান নারী আলোকচিত্রী মেরি এলেন মার্ক মুক্তিযুদ্ধের ছবি তুলেছেন। তার আলোকচিত্রের উদ্দেশ্য ছিল, সমাজের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষকে ক্যামেরার ফ্রেমে তুলে আনা। তার ছবিতে প্রকাশ পেয়েছে একাত্তরে বন্দি রাজাকারদের চিত্র। একাত্তরে হাফপ্যান্ট পরা শীর্ণ দেহের এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার হাতে তার প্রায় সমান উচ্চতার একটি রাইফেল। মাথায় কুড়িয়ে পাওয়া একটি হেলমেট, যা তার মাথা থেকেও বড়। একাত্তরের বিখ্যাত এই ছবিটিও মেরির তোলা।
ব্রিটিশ ফটোসাংবাদিক স্যার ডন ম্যাককলিনও মুক্তিযুদ্ধের ছবি তুলেছেন। তিনি তখন ছিলেন সানডে টাইমস ম্যাগাজিনের বিদেশ প্রতিনিধি। মূলত তার ছবিতে উঠে এসেছে ভারতে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া বাঙালিদের দুর্দশার চিত্র। তার তোলা কলেরায় মৃত স্বজনের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শীর্ণ ও ছিন্নবস্ত্রের মানুষের ছবিটি বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের আত্মত্যাগকেই তুলে ধরে।
আরেক ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার জন ডাউনিংয়ের জন্ম সাউথ ওয়েলসে। ১৯৭১ সালে তিনি কাজ করতেন ‘দি এক্সপ্রেস’ পত্রিকায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনিও ছবি তুলেছেন শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে। সেসময় একটি ছবি তুলতে গিয়ে তাকে কয়েক ঘণ্টা কাঁদায় ডুবে থাকতে হয়েছিল। শরণার্থী ক্যাম্পে কলেরায় আক্রান্ত বাঙালিদের নানা দুর্দশার চিত্র উঠে আসে তার ক্যামেরায়।

মরক্কোয় জন্ম নেওয়া ফরাসি আলোকচিত্রী ব্রুনো বার্বির ক্যামেরায়ও উঠে আসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। ওই সময় তিনি কাজ করতেন ম্যাগনাম ফটোজে। মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনাদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর যোদ্ধা ও শরণার্থীদের ছবি তুলে আনেন এই আলোকচিত্রী।
এছাড়া ব্রিটিশ সাংবাদিক উইলিয়াম লাভলেস একাত্তরের ডিসেম্বরে ভারতীয় সেনাদের যশোর রোড সংস্কার করার ছবি তুলেছেন। আর ব্রিটিশ আলোকচিত্রী এডওয়ার্ড রজার গোয়েন স্বাধীনতা লাভের পরপরই ক্যামেরায় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে তুলে আনতে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের আনাচে-কানাচে।
তাছাড়া একাত্তরের ছবি ক্যামেরাবন্দি করেন রোমানো ক্যালিওনি, পিটার ডান, অ্যালান লেদার, ক্রিস স্টিল-পার্কিন্স, মার্ক এডওয়ার্ডস ও ডেভিড বার্নেটের মতো বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্রীরা। তাদের তোলা সেই ছবিগুলোই আজকালের সাক্ষী হয়ে আছে।
একাত্তরের বিভীষিকা ও গণহত্যার কোনো ছবি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বা পুরস্কার লাভ করেনি। কিন্তু ঘটেছে উলটো ঘটনা। ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১। বাঙালিদের হাতে ধরা পড়া চার পাকিস্তানি অনুসারী ও রাজাকারকে নির্যাতনে মৃত্যুর দৃশ্য উঠে আসে ‘অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’-এর (এপি) তৎকালীন ফটোগ্রাফার হোস্ট ফাস ও মাইনেল লরেন্টের ক্যামেরায়। তাদের তোলা সে ছবি ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো অ্যাওয়ার্ড ও পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিল।
একাত্তরে দেশি ও বিদেশি আলোকচিত্রীদের তোলা ছবিগুলোর পেছনের ইতিহাসও আজ মিশে আছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে। তারা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন এ দেশের মানুষের হৃদয়ে।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কিডজে, প্রকাশকাল: ১৯ আগস্ট ২০২৫
© 2025, https:.




