আদিবাসী

বোনের রক্ত খেয়েছিল যে ভাইয়েরা

তখন সন্ধ্যা নামছে। চারপাশের আলোও ম্লান হয়ে এসেছে। আমরা তখনও হালজায়, কড়া পাড়ায়। ভ্যানের অপেক্ষায়। এ আদিবাসী পাড়াটি থেকে দিনাজপুরের বিরল উপজেলায় যাওয়ার একমাত্র গণপরিবহন ওই একটি। কড়া গোত্রের প্রধান বা মাহাতো জগেন আমাদের সঙ্গ দিচ্ছেন।

রাস্তার পাশেই মাটি আর ছনে ছাওয়া একটি বাড়ি। ভেতরে খুপরির মতো দুটি ঘর। কোনো জানালা নজরে এলো না। হঠাৎ আদিবাসী ভাষায় কিছু একটা বলতে বলতে বেরিয়ে আসেন বাবলী কড়া। মধ্য যৌবনা। মাথায় তার ভরাট সিঁদুর। তবে চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। আমাদের দেখে বিনীত ভঙ্গিতে বললেন- জোহার। আমরাও মাথা নেড়ে হাসিমুখে জবাব দেই।
সমতলের অন্য আদিবাসীদের মতো কড়ারাও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। মাহাতো জগেনের ধারণা পূর্বপুরুষদের আমলে হয়তো কৃষি ছাড়া অন্য কোনো কাজের সুযোগ ছিল না। তাই আজও কড়ারা কৃষি পেশাতে যুক্ত থাকতেই বেশি পছন্দ করে।

কিন্ত সময়ের গতিতে পূর্বপুরুষদের পেশাগুলোকে আদিবাসীরা আর ধরে রাখতে পারছে না। তাই পাড়ার অন্য নারীরা যখন মাঠের কাজে ব্যস্ত থাকে, বাবলীর ব্যস্ততা তখন রেশম পোকাগুলোকে নিয়ে। পোকা রাখার জায়গাটি পরিস্কার করে, তুঁতপাতা খাইয়ে রেশম পোকাগুলোকে বড় করে বাবলী। পাতা খাওয়ানোর নিয়মও আছে। বাবলীর ভাষায় প্রথম সপ্তাহে-নারাম পাতেই (কঁচি পাতা), ২য় সপ্তাহে -মাঝ পাতেই (মাঝের পাতা), ৪র্থ সপ্তাহে- সাকাত পাতেই (শক্ত পাতা) খাওয়াতে হয়।

দিনে কয়বার খাওয়াতে হবে? এমন প্রশ্নে বাবলী বলে, পোততেক দিন চাইরবার কেরকে খাওয়া দিয়েল লাগত। দুইবার পাতেই তরলে লাগতে, একবার বিহানে একবার বিকেলে (প্রতিদিন চারবার পাতা খাওয়াতে হয়। পাতা পারতে হয় দুইবার। একবার সকালে, একবার বিকেলে)। রেশম হলে বাবলী তা কেজি প্রতি ১২০ টাকা ধরে বিক্রি করে স্থানীয় এক এনজিওতে।

বাবলীর ঘর থেকে বেরোতেই চারপাশে আলোর ছটা। পূর্ব আকাশে উঠেছে ঝলমলে চাঁদ। রাতকে ভুলিয়ে দিচ্ছিল স্নিগ্ধ চাঁদের আলো। পূর্ণিমার আলোয় অন্যরকম লাগছিল কড়া পাড়াটি। মাটির ঘরের পাড়াটিকে মনে হচ্ছিল যেন কোন এক কল্পগ্রাম।

হঠাৎ একটি বাড়ি থেকে ভেসে আসে এক নারী কন্ঠ। কান পাততেই শুনি ভরাট কন্ঠে আদিবাসী ভাষায় বলছে কোন গল্প। মাহাতোকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দেখি অবাককাণ্ড!
বাড়ির উঠানে গোটা পাড়ার বাচ্চাদের যেন হাট লেগেছে। মাদুর বিছিয়ে সুনিয়াকে ঘিরে বসেছে তারা। সুনিয়ার বয়স সত্তুরের মতো। যেন গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসেছেন তিনি। পিনপতন নীরবতার মধ্যে মধুমাখা কন্ঠে গল্প শোনাচ্ছেন সুনিয়া। সবার দৃষ্টি তার দিকে। চোখের পলক যেন পড়ছেই না। গল্প শোনায় মশগুল সবাই। আমরাও একপাশে বসে পড়ি। চাঁদের আলোয় বসে শুনি কড়াদের লোকগল্প। ভাষা বোঝাতে গোত্রের মাহাতো আমাদের সাহায্য করেন।

গল্পের নাম-সাত ভাই এক বেহিন। গল্পটির ভাবার্থ অনেকটা এরকম :
এক পরিবারে ছিল সাত ভাই আর এক বোন। তাদের বাবা মা বেঁচে ছিল না। ছোট ভাই ছাড়া বাকি ভাইরা ছিল সংসারি। কিন্ত তবু বাড়ির রান্নাবান্নার সব কাজ করতে হতো বোনকে। আবার বোনটি সবচেয়ে বেশি আদর করতো ছোট ভাইটিকে। ছোটভাইও তাই। আনন্দ হাসির মধ্যে দিয়েই কেটে যাচ্ছিল তাদের সংসার।

একদিন ঘটল একটি ঘটনা। শাকপাতা কাটতে গিয়ে কেটে যায় বোনের কানি আঙ্গুল। আঙ্গুল থেকে গলগলিয়ে রক্ত পরতে থাকে শাকপাতায়। বোনটি তা না ধুয়েই রক্তমাখা শাকপাতা রান্না করে ফেলে। সে রান্না মুখে দিতেই ভাইদের কাছে অমৃতের মতো লাগে।

হঠাৎ রান্না এমন সুস্বাদু হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বোনটি কড়া ভাষায় ভাইদের বলে-হামার কেনি ইংরিয়ে কাটায় গেল লে। লোহু গিয়াল লে শাগোয়া মে।

রান্নায় বোনের রক্ত খেয়ে লোভী হয়ে ওঠে ভাইরা। বোনের রক্তই যদি এতটা সুস্বাদু হয় তবে তো তার মাংস আরও মজার হবে। তাই গোপানে তারা পরিকল্পনা করে বোনকে হত্যা করে তার মাংস খাওয়ার। কিন্ত ছোট ভাই তাতে রাজি হয় না। ফলে অন্য ভাইরা তাকেও হত্যার ভয় দেখায়। ভয়ে ছোটভাই অন্য ভাইদের কথা মতো কাজ করতে থাকে।

পরিকল্পনা করে ভাইরা মাঠের পাশের এক জায়গায় তৈরি করে বাঁশের উঁচু একটি মাচা। কড়া ভাষায় -মাছরি। উদ্দেশ্য বোনকে বিজারের (তীর) আঘাতে হত্যা করা। তারা বাড়ি থেকে বোনকে ডেকে এনে মাচায় উঠতে বলে। বড় ভাই বলে -ওখানে উঠলে তুমি ফুপুর বাড়ি দেখতে পাবে। ফুপুর বাড়ির কথা শুনেই বোন মাচায় উঠে পড়ে। এই ফাঁকে ভাইরা তৈরি হয়ে নেয় তীর-ধনুক নিয়ে। ভাইদের হিংস্রতা দেখে বোন তো হতবাক। প্রিয় ভাইদের খুশির জন্য সে নিজেকেই উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

নিচ থেকে তীর ছুড়ে কোন ভাই হত্যা করতে পারছিল না বোনকে। সবার পরে আসে ছোট ভাইয়ের পালা। সে চায় না তীর ছুড়তে। কান্না জড়ানো কন্ঠে সে অন্য ভাইদের বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্ত পাষাণ ভাইরা তার তোয়াক্কা করে না। শেষে ছোটভাই চোখ বন্ধ করে ছুড়ে দেয় তীর। অমনি তীর গিয়ে বিদ্ধ হয় বোনের বুকে।

নিজ হাতে বোনের মৃত্যুতে ছোটভাই মুষড়ে পড়ে। কিন্ত বাকীরা ব্যস্ত থাকে বোনের মাংস কেটে রান্না করায়। তারা ছোটভাইকে বাড়ি পাঠায় ভাত আনতে। ছোটভাই বাড়ী গিয়ে ভাতের সঙ্গে মাছ আর কাকড়া রান্না করে নিয়ে আসে গোপনে। খেতে বসে অন্য ভাইরা যখন বোনের মাংস দিয়ে খাচ্ছিল সে তখন ছোট্ট একটি গর্তে রেখে দেয় প্রিয় বোনের মাংসগুলো। অন্যরা যখন বোনের হাড্ডি খাচ্ছিল ছোটভাই তখন শব্দ করে কাকড়া খেলো। খাওয়া শেষে সে ওই গর্তটিতে মাটি চাপা দিয়ে চলে আসে।

কয়েকদিন পর ওই জায়গা দিয়ে যাওয়ার সময় ছোটভাই দেখলো সেই গর্ত থেকে একটি সুন্দর বাঁশগাছ হয়েছে। সে অবাক হলো। সেখান থেকে একটি বাঁশ কেটে আনলো-মুরালী (বাঁশি) বানানোর জন্য। মুরালী বানাতেই তাতে অন্যরকম সূর ওঠে।

বাড়িতে বাঁশি আনার পর ঘটলো অন্য ঘটনা। প্রতিদিন সকালে ছোটভাই যায় কাজে। ফিরে এসে সে দেখে কে যেন তার বাড়িঘর পরিস্কার করে রান্না করে দিয়েছে। সে ভাবল হয়তো তার বৌদিরা এসব করেছে। তাদের জিজ্ঞেস করলে তারা না বলে। সে তখন চিন্তিত হয়ে পড়ে। একদিন কাজে না গিয়ে সে লুকিয়ে দেখলো সবকিছু।

সে দেখল- তার বাঁশি বোনের রূপ নিয়ে ঘরের সব কাজ সারছে। ছোটভাই খানিকটা ভয় পেয়ে যায়। সে তার অন্য ভাইদের ঘটনাটি খুলে বলে। তারাও লুকিয়ে সব দেখে। একদিন ছোটভাই কাজে বের হতেই অন্যভাইরা তার ঘর থেকে বাঁশিটাকে নিয়ে বড় দিঘীতে ফেলে দেয়।

একদিন পর তারা দেখল বাঁশিটি দিঘীর মধ্যে একটি সুন্দর শাপলা ফুলের রূপ নিয়েছে। বড় ভাই দিঘীতে নেমে শাপলাটি তুলে আনতে যায়। যতই সে এগোয় ততই শাপলাটি চলে আসে মাঝ দিঘীতে। ফলে শাপলা তুলে আনতে গিয়ে বড় ভাই ডুবে মরে দিঘীতে। এভাবে একে একে ডুবে যায় ছয় ভাই-ই। খবর পেয়ে আসে ছোট ভাই। সে দিঘীতে নামতেই শাপলাটি তার নিকটে চলে আসে। স্পর্শ করতেই সেটি তার বোন হয়ে ডাঙ্গায় উঠে আসে। এভাবে বোনকে ফিরে পেয়ে ছোটভাই মহাখুশি। ছোটভাইয়ের ভালবাসায় প্রাণ ফিরে পায় বোনটি। আর পাপের শাস্তিতে ডুবে মরে ছয়ভাই।

এরকম অসংখ্য কাহিনি প্রচলিত আছে আদিবাসী সমাজে। কড়া আদিবাসী সমাজে প্রচলিত এমন কাহিনির মাধ্যমে তারা শুধু নারী সমাজের প্রতি গুরুত্বারোপই করে নি বরং ব্যক্তির লোভের ভয়ানক পরিণতিরও শিক্ষা দেয় পরবর্তী প্রজন্মকে।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে সারাবাংলা ডটনেটে, প্রকাশকাল: অক্টোবর ৫, ২০১৮

© 2018, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button