মুক্তিযুদ্ধ

স্বাধীনতা দিবস হওয়া উচিত ছিল ৭ মার্চ

১৪ আগস্ট। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। তখন এই দিনটি ঘটা করেই পালন করা হত। কীর্তনখোলা নদীতে চলত নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। নানা রঙ-ঢঙে নৌকা সাজিয়ে ভিড় জমাত দূর-দুরান্তের মানুষ। সবার মধ্যে টানটান উত্তেজনা। নৌকাবাইচ দেখতে আমরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকতাম। বন্ধু দেলোয়ার মুন্সি, আবদুল মান্নান, ইউসুফ আলী চৌধুরী, জালাল, শামসুল হকসহ দলবেঁধে হৈ-হুল্লোড় করে তা দেখতে যেতাম।

সে সময় মহররমও ধুমধামের সঙ্গে পালন করা হত। বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমরা চাল-ডাল আর টাকা তুলতাম। তা দিয়ে মহররমের দিন রান্না হত খিচুড়ি। হাডুডু ও ফুটবল ছিল পছন্দের খেলা। সবচেয়ে আনন্দ পেতাম কীর্তনখোলা নদীতে ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ ধরতে। ইস! আজও মন চায় ছুটে যাই কীর্তনখোলার বুকে।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এস এম মোফাজ্জল হোসেন এভাবেই তাঁর একাত্তরের গল্প বলতে শুরু করলেন। কীর্তনখোলার তীরে বেড়ে ওঠা এই যোদ্ধা খানিক দম নিয়ে আবার বলতে থাকেন–

ছোটবেলা থেকেই আমি ডানপিটে। সময় কাটত বন্ধুদের আড্ডায়। দুষ্টুমি ছিল আকাশচুম্বী। মাঝে মধ্যেই বাড়িতে বিচার আসত। বাবা একবার খুব রাগ করলেন। বললেন, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে। কথাটি প্রায়ই বলতেন তিনি। কিন্তু তিনি কখনও ভাবেননি ঘর ছাড়ব। সেবার আমিও বেঁকে বসি। কাউকে কিছু না বলেই বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে আসি ঢাকায়। মেজ খালা ওয়াজিবুন নেসা তখন থাকতেন ঢাকার মগবাজের ৩৯৪ নম্বর বাড়িতে।

সময়টা ১৯৬৯। ঢাকা তখন উত্তপ্ত। মিছিল মিটিংয়ে আমরা সক্রিয়। মাঝে মধ্যে কারফিউ দেওয়া হত। গা ঢাকা দিতাম তখন। রাজনৈতিক মিটিংগুলো তখন হত আউটার স্টেডিয়ামে। সত্তরের নির্বাচনে আমরা মাঠে নামি। কাজ করি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে।

সময় গড়িয়ে আসে ১৯৭১। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন রেসকোর্স ময়দানে। ওইদিন দুপুরে মগবাজার থেকে নাজমুল, ফেরদৌসসহ আমরা যাই ভাষণ শুনতে। রেসকোর্স ময়দানে তখন লোকে লোকারণ্য। এত বড় জনসভা আমি কখনও দেখিনি। দেশ তখন উত্তপ্ত। সবার মুখে একই প্রশ্ন। কী বলবেন বঙ্গবন্ধু? ‘ভায়েরা আমার’ বলে ভাষণ শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। বললেন– ‘‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে…।’’

কণ্ঠ আকাশে তুলে আমরা তখন স্লোগান তুললাম। বঙ্গবন্ধু আরও বললেন– ‘‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম…।’’

আজও ওই ভাষণ শুনলে শরীরের লোমগুলো দাঁড়িয়ে যায়। রক্ত এখনও টলমল করে। মুক্তিযুদ্ধের সব নির্দেশনাই দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ওই ভাষণের পরই মনের ভেতর আমরা স্বাধীনতার বীজ বুনি।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নানা ঘটনা শুনছিলাম যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এস এম মোফাজ্জল হোসেনের মুখে। তার বাড়ি বরিশাল সদর উপজেলার চর করানজি গ্রামে। বাবা হাতেম আলী সিকদার কৃষিকাজ করতেন, আর মা সৈয়দা তাজিমন নেছা ছিলেন সাধারণ গৃহিণী। তিন ভাই ও এক বোনের সংসারে তিনি ছিলেন মেজ। তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে গ্রামের বাড়িতেই। লেখাপড়ায় হাতেখড়ি দিনার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন চর আইসা গ্রামের এয়ার খান ইনিসটিটিউডে। সেখানে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর চলে যান ঢাকাতে। ভর্তি হন সিদ্ধেশরী হাই স্কুলে। একাত্তরে তিনি এ স্কুলেরই এসএসসি পরিক্ষার্থী ছিলেন।

মোফাজ্জল হোসেন যুদ্ধ করেন ৯ নং সেক্টরে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের ছোঁড়া একটি গুলি তার ডান পায়ের হাঁটুতে বিদ্ধ হয়। ফলে হাঁটুর হাড় ছয় ইঞ্চি ভেঙে উড়ে যায়। পরে সেখানে আর্টিফিশিয়াল বন লাগিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে ডান পা তিনি ভাঁজ করতে পারেন না।

পঁচিশ মার্চ মধ্যরাত। গোলাগুলির শব্দে সবাই ভয়ে তটস্থ। যে যার মতো ঢাকা ছাড়ছে। খুব ভোরে মোফাজ্জলরা মগবাজার থেকে রওনা হন গ্রামের উদ্দেশে। পায়ে হেঁটে প্রথমে লৌহজং এবং পরে লঞ্চে করে চলে যান বরিশাল শহরে।

ট্রেনিংয়ের কথা উঠতেই তিনি বলেন, ‘‘বরিশাল তখনও মুক্ত। ওখানকার নেতা ছিলেন নূর ইসলাম মঞ্জু। সত্তরের নির্বাচনে তিনি এমপি হয়েছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন সার্জেন্ট ফজলুল হক, সরদার জালাল আহমেদ প্রমুখ। তাদের উদ্যোগেই ট্রেনিংয়ের আয়োজন হয়। এপ্রিলের এগার তারিখ। বরিশাল ভিলেজ পার্কে আমি ট্রেনিং নিই। আমাদের দলে ছিল চল্লিশ জন। ট্রেনিং করান সুবেদার মেজর মান্নান সাহেব। পরে ওনার অধীনেই আমরা যুদ্ধ করি। লিলিং, লাইন, স্টেনডিং, আর্মস ক্রেরিং, ফায়ার করা, ক্রলিং প্রভৃতি শেখানো হয় আমাদের। ১৮ এপ্রিল ১৯৭১। বরিশাল শহর দখলে নেয় পাকিস্তানি আর্মি। আমরা তখন গ্রামের দিকে চলে যাই। মান্নানের নেতৃত্বে ক্যাম্প গাড়ি গজনী দিঘীর পাড়ে। তখন ক্যাম্পের টো-আইসি ছিলেন হাবিলদার মোকসেদ আলী খান।’’

কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছেন ?

মোফাজ্জলের উত্তর, ‘‘আমার ছিলাম গেরিলা। আঘাত করেই সরে পড়তাম। মাঝে মধ্যে হ্যারেসমেন্ট ফায়ার করতে হত। আমরা একটি গুলি করলে ওরা করত দশটি। ওদের গুলি নষ্ট করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। ৯ নং সেক্টরের অধীনে আমরা যুদ্ধ করি বাকেরগঞ্জ, নলছোটি, টঙ্গিবাড়িয়াসহ বরিশালের বিভিন্ন জায়গায়।’’

তিনি বলেন, ‘‘সে সময় এম আক্তার মুকুলের চরমপত্র শোনার জন্য আমরা অপেক্ষায় থাকতাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হত দেশাত্ববোধক ও নজরুলের বিদ্রোহের গান। এগুলো আমাদের প্রেরণা জোগাত।’’

কোন অপারেশনে গুলিবিদ্ধ হলেন?

১৯৭১ সাল থেকে ডান পা ভাঁজ করতে পারেন না যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন

এমন প্রশ্নে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন খানিকক্ষণ চুপ করে থাকেন। অতঃপর লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে বলতে থাকেন, “২৯ নভেম্বর ১৯৭১। ভোরবেলা। কীর্তনখোলা নদীর ঘাটে আসে রাজাকারদের কয়েকটি নৌকা। ওত পেতে আমরা তাদের ওপর আক্রমণ করি। ফলে মারা পড়ে কয়েকজন রাজাকার। বাকিরা পালিয়ে যায়। তারা উল্টো অ্যাটাক করতে পারে। এই চিন্তা থেকেই আমরা চর আইসায় নদীর পাড়ে অ্যামবুস করে বসে থাকি। আমাদের দুশ জনের দলে কমান্ডার ছিলেন মান্নান সাহেব।

৩০ নভেম্বর। রাত তিনটা। কমান্ডারের নির্দেশে আমরা অ্যামবুস তুলে ফেলি। সেকশন কমান্ডার আবদুর রব, আলমগীর ও আমি ছুটি পাই রেস্টের জন্য। নদীর পাড়ের একটি বাড়ির দিকে আমরা রওনা হই। আমাদের পেছন দিকে ছিল চর কাউয়া ঘাট। ওদিক দিয়ে ঢুকে পড়ে পাকিস্তানি আর্মিরা। আমরা তার কিছুই টের পাই না। বাড়ির ভেতর ঢুকতেই হঠাৎ তারা পেছন থেকে আমাদের ওপর আক্রমণ করে। চারপাশ ঘিরে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে। একটি গুলি এসে লাগে আমার ডান পায়ে। আমি উঠানের এককোণে ছিটকে পড়ি। আলমগীর ও রব কোনো রকমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যায়।

পাকিস্তানিদের গুলির আঘাতে আমার ডান পায়ের হাঁটুর ওপরের হাড় ভেঙে মাংসসহ উল্টে যায়। রক্ত পড়ছিল গলগলিয়ে। গোটা উঠান রক্তে লাল। ধীরে ধীরে আমি দুর্বল হয়ে পড়ি। ঝাপসা হয়ে আসে চোখ দুটো। কিন্তু তবুও জ্ঞান হারাই না। রক্তাক্ত দেহ দেখে পাকিস্তানি সেনারা ভেবেছে মরে গেছি। তারা চলে যেতেই আমার কাছে ছুটে আসেন সহযোদ্ধারা। তখনও রক্ত পড়ছিল। তা বন্ধ করতে রব একটি শক্ত দড়ি দিয়ে পা বেঁধে দেন। বাঁধার দাগটি এখনও মিলিয়ে যায়নি। আজও দেখলে সবকিছু জীবন্ত হয়ে ওঠে।

কোথায় কোথায় চিকিৎসা চলল?

তিনি বলেন, ‘‘একটি টিনে করে আমাকে নেওয়া হয় ওই গ্রামেরই হাসন মিঞার বাড়িতে। সেখানেই চলে প্রাথমিক চিকিৎসা। ৮ ডিসেম্বর মুক্ত হয় বরিশাল। ১০ তারিখ আমাকে নেওয়া হয় বরিশাল সদর হাসপাতালে। সম্মান জানাতে সে সময় সহযোদ্ধারা আমার দুইদিকে দাঁড়িয়ে উপরে ফাঁকা গুলি করতে থাকে। বুকটা ভরে গিয়েছিল সেদিন। এমন সম্মান আমি কখনও পাইনি। আজও মনে হলে আনন্দে চোখ ভিজে যায়। বরিশাল থেকে আমাকে পাঠানো হয় কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা হাসপাতাল (পুরাতন পিজি)-তে। সেখান থেকে সরকারি উদ্যোগে নেওয়া হয় ডেনমার্কে। অপারেশন করে ৬ ইঞ্চি আর্টিফিসিয়াল বন লাগিয়ে দেওয়া হয় আমার ডান পায়ে।’’

শারীরিক কষ্টের কথা বলতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল বলেন, ‘‘চলতে হয় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। বিয়াল্লিশ বছর ধরে ডান পা ভাঁজ করতে পারি না। পা পৌনে এক ইঞ্চি ছোট হয়ে গেছে। প্রস্রাব-পায়খানা করতে হয় অন্যের সাহায্যে। সামাজিক কোনো জায়গায় যেতে পারি না।’’

মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষের সহযোগিতার কথা উঠতেই তিনি বলেন, ‘‘মুসলিম লীগ, জামায়াত, নিজামী ইসলাম ছাড়া সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। তারা আমাদের খাবার ও খবর দিয়ে সাহায্য করত। বরিশাল জেলার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। ওই সময় যারা মাদ্রাসায় লেখাপড়া করত তারা অধিকাংশই ছিল পাকিস্তানি আদর্শে উজ্জীবিত। এই ধারা এখনও অটুট আছে।’’

স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে ভাগ হওয়াকে কালো অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন এই মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, ‘‘স্বাধীনতার পর সেক্টর কমান্ডার ও সাব-সেক্টর কমান্ডাররা মন্ত্রী ও এমপি হওয়ার জন্য যোগ দেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে। তাদের হাত ধরেই রাজনীতিতে আসেন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা। এতে মুক্তিযোদ্ধারা হারান তাদের সর্বজনীনতা। স্বাধীনতাবিরোধীতাকারীরা আজও সুসংগঠিত। অথচ আমাদের এক মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে অন্য মুক্তিযোদ্ধার সুসম্পর্ক নেই।’’

মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রসঙ্গে মোফাজ্জল বলেন, ‘‘স্বাধীনতার পর পরই এ তালিকা চূড়ান্ত করা যেত। তখন সব সেক্টর কামান্ডারের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ছিল।’’

বিয়াল্লিশ বছর পরও তালিকা কেন বাড়ে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘রাজনৈতিক কারণ তো রয়েছেই। এছাড়া কিছু সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাদের লোভই এর জন্য দায়ী। এ তালিকা এখনই বন্ধ হওয়া দরকার।’’

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জলের পরিবার চলে সরকারি ভাতার ওপর। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানের বিষয়ে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘পাওয়ার জন্য কিছু করিনি। তবে বেঁচে থাকার জন্য এখন কিছু প্রয়োজন।’’

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল মনে করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস হওয়া উচিত ৭ মার্চ

মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে স্বাধীনতার ঘোষণা তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না বলে জানান মোফাজ্জল। তবে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে জিয়াউর রহমানের ঘোষণাটি কিছুটা মনোবল বাড়িয়ে দেয় তাদের। তিনি বলেন, ‘‘সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসাররাও আমাদের সঙ্গে আছেন– এ বিষয়টিই আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়।’’

তিনি মনে করেন, ২৬ মার্চ নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস হওয়া উচিত ছিল ৭ মার্চ। কেননা সেদিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণই অধিকাংশ বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল মুক্তিযুদ্ধের জন্য।

বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা প্রসঙ্গে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘‘ক্ষমা করাটা ঠিক ছিল না। ছোট ছোট তথ্য যারা দিয়েছে তার ভিত্তিতেই বড় বড় অপরাধ সংগঠিত হয়েছে। তাই অপরাধের শ্রেণিভাগ না করে তাদেরও বিচারের আওতায় আনা দরকার ছিল।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের অনেককেই রাজাকাররা ধরিয়ে দিয়েছিল। যে ওই তথ্যটি দিয়েছে সে কি অন্যায় করেনি? আজ যদি দেশ স্বাধীন না হত তারা কি মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচিয়ে রাখত?’’

পচাঁত্তরের পর বাতিল হয় দালাল আইনটি। ফলে রাজনীতিতে আসে রাজাকাররা। সে পথ ধরেই স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রী হন রাজাকার। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল বলেন, ‘‘রাষ্ট্রপতি রাজাকার, এ লজ্জা জনতার। এর চেয়ে লজ্জার ও ঘৃণার কিছু থাকে না।’’

খারাপ-লাগা অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘যখন দেখি ইসলামের নামে বোমাবাজি করে মানুষ মারা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলে পাকা আসন গেড়েছে স্বাধীনতাবিরোধীরা– তখন সত্যি কষ্ট লাগে।’’

মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘এ জাতি মুক্তিযোদ্ধাদের মন থেকে স্মরণ করবে তখন, যখন এদেশে কোনো মুক্তিযোদ্ধা থাকবে না। ভবিষৎ প্রজন্ম তখন ঠিকই উপলব্ধি করতে পারবে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের ইতিহাসকে। তাই বিশেষভাবে প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণ করা।’’

স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভালোলাগার অনুভূতি জানতে চাই আমরা। ‘‘পা গেছে কিন্তু স্বাধীনতা তো পেয়েছি, এতেই আমি তৃপ্ত। সবাই যখন সম্মিলিতভাবে কাজ করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়– তখন ভালো লাগে। ১৬ ডিসেম্বর ও ২৬ মার্চে ভুলে যাই নিজের কষ্টের কথা’’– এভাবেই বললেন মোফাজ্জল।

পরবর্তী প্রজম্মের উদ্দেশ্যে বিশ্বাস ও আশা নিয়ে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘‘এ দেশ একদিন অনেক উন্নত হবে। তোমরা দেশপ্রেম নিয়ে কাজ কর। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে শেষ কর নিজের দায়িত্বটুকু। তাহলেই দেশ এগিয়ে যাবে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শুধু একটি জিনিসই চাই আমরা– চাই রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ।’’

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে, প্রকাশকাল: ৭ মার্চ ২০১৪

© 2014 – 2021, https:.

এই ওয়েবসাইটটি কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত। নিবন্ধন নং: 14864-copr । সাইটটিতে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Show More

Salek Khokon

সালেক খোকনের জন্ম ঢাকায়। পৈতৃক ভিটে ঢাকার বাড্ডা থানাধীন বড় বেরাইদে। কিন্তু তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকার কাফরুলে। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ও কর্মজীবন। ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক সংস্কৃতির প্রতি। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যুক্ত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও থিয়েটারের সঙ্গেও। তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ গ্রন্থটি ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে ‘কালি ও কলম’পুরস্কার লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী ও ভ্রমণবিষয়ক লেখায় আগ্রহ বেশি। নিয়মিত লিখছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক, সাপ্তাহিক, ব্লগ এবং অনলাইন পত্রিকায়। লেখার পাশাপাশি আলোকচিত্রে নানা ঘটনা তুলে আনতে ‘পাঠশালা’ ও ‘কাউন্টার ফটো’ থেকে সমাপ্ত করেছেন ফটোগ্রাফির বিশেষ কোর্স। স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযুদ্ধ, আদিবাসী এবং দেশের কৃষ্টি নিয়ে ভিন্ন ধরনের তথ্য ও গবেষণামূলক কাজ করার। সহধর্মিণী তানিয়া আক্তার মিমি এবং দুই মেয়ে পৃথা প্রণোদনা ও আদিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button